শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) এর স্মৃতিধন্য সৈয়দপুর মাদরাসার জলছা ছিল গত রাতে। শত শত বছর ধরে চলা বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিলের ঐতিহ্যবাহী ধারাটি এখনো যে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যমান, তার মধ্যে সৈয়দপুর অন্যতম।
‘ঐতিহ্যবাহী ধারা’ বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলি। ওয়াজ মাহফিল বা জলছা ছিল বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ ও প্রাণের উৎসব। কোনো এলাকায় ‘জলছা’ মানেই ছিল বার্ষিক উৎসবের আমেজ। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে নাইওরির আগমন, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করার আয়োজন, মেহমানদারি, বাজারে ও মাদরাসায় গরু জবাই, বাঁশ কাটা, প্যান্ডেল বাঁধা ও শিরনীর আয়োজনে এলাকার মুরব্বিয়ান ও যুবসমাজের সম্পৃক্ততা, স্বেচ্ছাশ্রম, মাহফিলে আসা দূরবর্তী মেহমানদেরকে ১০ জন/ ২০ জন/ ৫০ জন করে বাড়িতে নিয়ে মেহমানদারি করা, বিভিন্ন মাদরাসা থেকে নারায়ে তাকবির শ্লোগান দিয়ে দলে দলে ছাত্রশিক্ষকদের আগমন, আমন্ত্রিত বক্তাদের এস্তেকবাল করে আনা, বক্তাদের রাত্রিযাপন ও পরদিন বিভিন্ন বাড়িতে মেহমানদারি গ্রহণ, দাওয়াহ কার্যক্রম ও আওয়ামকে সহবত প্রদান- এই তামাম বিষয়গুলো এখন উঠে গেছে। এখন মাহফিলগুলোতে যান্ত্রিকতার ছাপ, মানুষের ভালোবাসার স্বেচ্ছাশ্রম অনুপস্থিত। দাওয়াত ও সহবত বিলুপ্ত। বক্তাদের পা এখন মাটিতে পড়ে না, গাড়ি থেকে নেমেই স্টেজ, স্টেজ থেকেই আবার বিদায়, জনগণের সাথে কোনো সংযোগ নাই। ফলে মাহফিলগুলো এখন প্রাণহীন, দাওয়াতি মেজাজহীন, আধ্যাত্মিক চেতনাহীন।

আলহামদুলিল্লাহ, কিছু কিছু এলাকায় এখনো প্রাচীন ধারাটি চালু আছে। যেমন হরিপুর, দারুল উলুম কানাইঘাট, এরকম আরও কিছু এলাকা। যাই হোক, সুনামগঞ্জে একটা চ্যারিটি কার্যক্রম শেষ করে রাতে গিয়ে আমরা হাজির হই সৈয়দপুর মাদরাসায়।মাদরাসার মুহতামিম সাহেব তাঁর দপ্তরে আমাদের মেহমানদারি করেন। এর মধ্যে তিনটি বাড়িতে আমাদের উঠতে হয়, আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমান (র.) এর বাড়ি, সৈয়দ সাইদুল হক মামার বাড়ি ও কবি শায়খ ফরীদ আহমদ রেজার বাড়ি। এর পর বিভিন্ন বুজুর্গদের সহবত ও দোয়া নিয়ে রাতেই শায়খ মুমিন আহমদ মবনু পীর সৈয়দপুরীর নেতৃত্বে আমাদের কাফেলা সিলেটে চলে আসে। সৈয়দপুরে যে বিষয়টি আমাকে আনন্দ দেয়, তা হলো মাদরাসা ও মাহফিলের সঙ্গে এলাকাবাসীর সম্পৃক্ততা, মাহফিলে আগত মেহমানদেরকে ১০ জন/ ২০ করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, এলাকার প্রতিটি পাড়া থেকে শিরনীর জন্য মাদরাসায় একটা করে গরু দান, বাড়িতে বাড়িতে উৎসবের আমেজ, নাইওরি, দাওয়াত। সেই প্রাচীন ঐতিহ্যবাদী ধারা।
ওয়াজ মাহফিলের ঐতিহ্যবাহী ধারাটি বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এর মাধ্যমে তাআল্লুক মাআল্লাহ ও তাআল্লুক মাআল আওয়াম গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।




