নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করলেন জোহরান মামদানি। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রী প্রার্থী নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এতে তিনি শুধু শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়রই নন, বরং প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করলেন।
মঙ্গলবার রাতেই যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম মামদানির জয় ঘোষণা করে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, তিনি মোট ভোটের ৫০ শতাংশেরও বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন। প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো পেয়েছেন প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট, আর রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া পেয়েছেন ৭ শতাংশের সামান্য বেশি।
ব্রুকলিনের প্যারামাউন্ট থিয়েটারে মামদানির নির্বাচনী শিবিরে ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর উল্লাসে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা। কেউ কেউ কেঁদে ফেলেন, আবার অনেকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলেন “এই শহর বদলাচ্ছে।”
উগান্ডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া মামদানি শৈশবে নিউইয়র্কে আসেন এবং ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব অর্জন করেন। তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত এক রাজ্য অ্যাসেম্বলিমেম্বার হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও, নিউইয়র্কে জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকট নিয়ে তার সোজাসাপটা বক্তব্য তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে দ্রুত সাড়া ফেলে।
তার নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল ভাড়া স্থির রাখা, আরও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৩০ ডলার করা, ধনীদের ওপর কর বৃদ্ধি এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বিনামূল্যে করার মতো অঙ্গীকার। ছোট অঙ্কের অনুদান, লাখো স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণার জোরে মামদানি গড়ে তোলেন এক শক্তিশালী ঘরোয়া আন্দোলন।
এমন এক সময় এই জয় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটি ছিল একটি সফল নির্বাচনী রাত। ভার্জিনিয়ায় প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার, আর নিউ জার্সিতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মিকি শেরিল জয় পেয়েছেন।
মামদানির বিজয়, তবে, ছিল নানা বিতর্ক ও আক্রমণের মধ্য দিয়ে অর্জিত। প্রাক্তন গভর্নর কুওমো তাকে “অভিজ্ঞতাহীন” আখ্যা দেন, আবার রিপাবলিকান শিবির ও ট্রাম্পপন্থীরা তাকে “চরমপন্থী” ও “কমিউনিস্ট” বলে আক্রমণ চালান। ট্রাম্প নির্বাচনের আগের দিন কুওমোকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেন এবং বলেন, “মামদানি জিতলে নিউইয়র্কের জন্য ফেডারেল সহায়তা প্রায় অসম্ভব হবে।”
এমনকি নির্বাচনী প্রচারণায় মামদানি ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণেরও মুখোমুখি হন। তার সমালোচকেরা ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের অভিযোগে তাকে লক্ষ্যবস্তু বানান। কিন্তু এসব বাধা উপেক্ষা করে তিনি তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের এক বহুমাত্রিক জোট গড়ে তোলেন—যা শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই এক নতুন দিক উন্মোচন করে।
তার পাশে ছিলেন ডেমোক্র্যাট দলের শীর্ষ প্রগতিশীল নেতারা বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ, নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস ও গভর্নর ক্যাথি হকুল। যদিও দুই সিনেটর চাক শুমার ও কিরস্টেন জিলিব্র্যান্ড নিরপেক্ষ থাকেন।
ফল ঘোষণার পর মামদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। যেখানে দেখা যায়, সাবওয়ে ট্রেনের ঘোষণায় বলা হচ্ছে, “পরবর্তী ও শেষ স্টপ—সিটি হল।” ক্যাপশনে তিনি লেখেন, “এই শহর আমাদের সবার, আমাদের কাজ এখনই শুরু।”
জানুয়ারির প্রথম দিন নিউইয়র্ক সিটি হলে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন জোহরান মামদানি। তার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা। তবে মঙ্গলবারের রাতের উচ্ছ্বাস দেখে নিউইয়র্কবাসী যেন বিশ্বাস করতে চাইছে, শহরটির রাজনীতিতে সত্যিই এক নতুন যুগের সূচনা হলো।




