সিলেটের নাইওরপুল এলাকা। গত বৃহস্পতিবার রাতের সেই দৃশ্যটি ছিল কোনো টানটান উত্তেজনার চলচ্চিত্রের মতো। বেপরোয়া গতির একটি পিকআপ পথচারীদের প্রাণনাশের উপক্রম করে পালাচ্ছে, আর পিছু নিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। শেষমেশ ট্রাকটি আটকের পর বেরিয়ে এল থলের বিড়াল—ত্রিপল ঢাকা ৭০ বস্তা অবৈধ ভারতীয় জিরা। কিন্তু এই টানটান উত্তেজনার গল্পের ক্লাইম্যাক্স বা যবনিকাপাত ঘটেছে চরম এক বিড়ম্বনায়। যে পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে আইন রক্ষার ভার, তাদেরই একজন—সোবহানীঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শিপলু চৌধুরীর রহস্যজনক ‘অজ্ঞাত’ প্রীতি এখন নগরজুড়ে আলোচনার টক অব দ্য টাউন।
পাবলিক যখন ধাওয়া করে পিকআপটি এসএ পরিবহনের সীমানায় আটকে দিল, তখন সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই এক নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। আরটিভির সিলেট প্রতিনিধি পরিচয়ে হাসান মোহাম্মদ শামীম নামের এক ব্যক্তি এসে দাবি করেন, জিরার চালানটি তার বড় ভাইয়ের। ঠিক সেই সময়েই দৃশ্যপটে হাজির হন কাজিটুলার মানিক খানের ছেলে আব্দুস সাত্তার সালেহ মিন্টু। তিনি বুক ফুলিয়ে দাবি করেন, এই মাল তার এবং আদালতের নিলামে কেনা।
তদন্তে দেখা গেল, মিন্টুর দেখানো নথির সাথে মালের কোনো মিল নেই। নথিতে বস্তা প্রতি ২০ কেজি উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে পাওয়া যায় ৩০ কেজি। অর্থাৎ, নিলামের একটি বৈধ কাগজকে ‘ঢাল’ বানিয়ে বারবার বড় বড় চোরাই চালান পার করার এক জঘন্য অপকৌশল সেখানে ধরা পড়ে।
একটি চুরির মামলায় চোর যখন পুলিশ এবং জনতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দেয়, তখন তাকে ‘অজ্ঞাত’ বলার কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু এসআই শিপলু চৌধুরী যেন এক জাদুকরী কলম ব্যবহার করলেন। শুক্রবার (১৫ মে) যখন তিনি মামলা দায়ের করলেন, তখন সেখানে আব্দুস সাত্তার সালেহ মিন্টুর নাম উধাও! অথচ এই মিন্টু ঘটনার রাতে সবার সামনে দাঁড়িয়ে মালের মালিকানা দাবি করেছিলেন। প্রশ্ন উঠছে, যার নাম-ধাম ও পরিচয় শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ পেল, পুলিশের এজাহারে তিনি কেন ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামী? এটি কি নিছক ভুল, নাকি কোনো শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে বাঁচানোর সুপরিকল্পিত ছক?
অভিযোগের তীর আরও গভীরে। স্থানীয়দের দাবি, সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির সামনেই প্রতিদিন সীমান্ত এলাকার চিহ্নিত চোরাকারবারিদের আড্ডা বসে। পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে প্রতিদিন চোরাই পণ্যের ট্রাক কালিঘাট বা কদমতলীর উদ্দেশ্যে নির্বিঘ্নে চলে যায়। এমনকি এসআই শিপলু চৌধুরী নিজেকে সিলেটের তালতলা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে এক ধরণের স্থানীয় ‘প্রভাব’ খাটানোর চেষ্টা করেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে চোরাকারবারিদের এমন দৃশ্যমান সখ্যতা কি তবে এই ‘অজ্ঞাত’ মামলার নেপথ্য কারণ?
ঘটনার বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি খাঁন মোহাম্মদ মাইনুল জাকির যেন ‘কৌশলী মৌনতা’ অবলম্বন করেছেন। তদন্ত চলছে—এমন এক লাইনেই দায় সেরেছেন তিনি। অন্যদিকে, যার দিকে আঙুল উঠেছে, সেই এসআই শিপলু চৌধুরী সরাসরি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে মামলাটিকে এডিসি (মিডিয়া) স্যারের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, পুলিশ যদি চিহ্নিত অপরাধীদের বদলে ‘অজ্ঞাত’ আসামী খুঁজতে থাকে, তবে অপরাধ সিন্ডিকেট কি আরও বেপরোয়া হবে না?
জনতা যখন ঝুঁকি নিয়ে চোর ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়, তখন পুলিশ যদি সেই চোরকে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের করে দেওয়ার রাস্তা তৈরি করে দেয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সিলেটের সচেতন মহলের দাবি, এই ‘জিরা জালিয়াতি’ এবং এসআই শিপলুর ‘রহস্যজনক’ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, আদালতের পবিত্র নিলাম প্রক্রিয়া চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।




