বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি সংস্কারে ভয় পায় না, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম যদি মানুষের প্রয়োজনে না আসে, মানুষের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে সে সংস্কার কোনো কাজে আসবে না। আমরা যে পরিবর্তন চাচ্ছি, সংস্কার চাচ্ছি, সেই সংস্কার কাঠামো যদি মানুষের সার্বিক উপকারে না আসে, তাহলে সেই সংস্কার আমাদের শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারবে না। শিশুদের জন্য একটা নিরাপদ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে না পারলে, আজকের সংস্কারের স্লোগান কোনো কাজে আসবে বলে আমি মনে করি না।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ মাঠে ‘গণতান্ত্রিক পদযাত্রায় শিশু’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে গুমের শিকার বিভিন্ন ব্যক্তি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া শিশুদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ আর ‘মায়ের ডাক’। অনুষ্ঠানে অংশ নেন গুমের শিকার বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদী। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান, ‘মায়ের ডাক’-এর সংগঠক সানজিদা ইসলামসহ গুমের শিকার বিভিন্ন ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা। এ সময় দুই সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আশা করেছিলাম, পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিশুদের (গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্তান) পুনর্বাসনের জন্য একটি স্পেশাল সেল গঠন করবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, কাজটি হয়নি। আশা করেছিলাম, দেরিতে হলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাদের জন্য কিছু করবে। কিন্তু এখনো কিছু করা হয়নি। আমরা রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন চাচ্ছি। আমরা সংস্কার চাচ্ছি। কিন্তু সেই সংস্কার যদি মানুষের সার্বিক উন্নয়নে কাজে না আসে, শিশুদের ভবিষ্যত নির্মাণে সাহায্য না করে, তাদেরকে একটা নিরাপদ-নিশ্চিত জীবন দিতে না পারে, তাহলে সেই সংস্কার কোন কাজে আসবে না। সরকার শিশু কিংবা শহীদ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য তেমন কিছুই করেনি।
গুম হওয়া মানুষের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বিএনপি’র মহাসচিব বলেন, ‘একটি কমিশন করা হয়েছে। এই কমিশন এখন পর্যন্ত একটা রিপোর্ট নাকি করেছে। কিন্তু তাদের (গুম হওয়া ব্যক্তি) খোঁজ করা, এ বিষয়ে খুব বেশি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। আশা করবো সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। গুমের শিকার পরিবারগুলো যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, আমরা কিন্তু সেই ত্যাগ অনেকেই করতে পারিনি। যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিশুদের বলতে শুনি যে, আমি আমার বাবাকে দেখতে চাই, বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতে চাই, ঈদের মাঠে নামাজ পড়তে যেতে চাই- তখন আমি আর আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
পটপরিবর্তনের পর শিশুদের জন্য তেমন কিছু করা হয়নি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেকেই বড় বড় পদে বসে গেছি। অনেকে মন্ত্রী (উপদেষ্টা) হয়েছি, বড় কর্মকর্তা হয়েছি, অনেকে বড় বড় ব্যবসা নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এই শিশুদের কথা ঠিক সেইভাবে সামনের দিকে আনতে পারিনি। আমি এটুকু কথা দিতে পারি, জনগণের ভোটে যদি আগামী নির্বাচনে আমরা (বিএনপি) সরকার গঠন করতে পারি, তাহলে আমাদের নেতা তারেক রহমান কথা দিয়েছেন যে, এই শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য তিনি কাজ করবেন। আমরা সেই কথাটা আবারও উচ্চারণ করতে চাই।
এর আগে, দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘শফিউল বারী বাবু স্মৃতি পরিষদ’ আয়োজিত আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা খুব খুশি হই যখন পত্রিকায় একটা পজিটিভ নিউজ দেখি। আজকেই খবরের কাগজে দেখলাম, বোধহয় ১২ টা মৌলিক বিষয় পরিবর্তনে সবগুলো দল এক হয়েছে। দিস ইজ এ পজিটিভ স্টেপ এবং আমি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার টিমকে নিয়ে অন্তত ওই জায়গাটায় আসার চেষ্টা করেছেন।
সংস্কার প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদেরকে অনেকে খোটা দিয়ে কথা বলে যে, আমরা সংস্কার চাই না। সংস্কারের চিন্তাটাই তো আমাদের, সংস্কারের শুরু আমাদের দিয়ে। ১৯৭৫ সালের আগে শেখ মুজিবুর রহমান যিনি ফ্যাসিজমের মূল হোতা তিনি গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে একদলীয় শাসন বাকশাল করেছিলেন। সেই বাকশাল থেকে ফিরিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র নিয়ে এসে মাল্টি পার্টি সিস্টেমের যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করলেন কে? আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান সমস্ত অন্ধকারকে মুক্ত করলেন। এই বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ইত্যাদি সংস্কার শুরু করলেন জিয়াউর রহমান। এগুলো ছিল তার রাজনৈতিক সংস্কার। আর অর্থনৈতিক সংস্কার কী ছিল? একটা বদ্ধ তথাকথিত ভ্রান্ত অর্থনৈতিক ধারণা থেকে তিনি নিয়ে এলেন মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণায় এবং সেটা করে তিন-সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের চেহারা বদলে গেলো। কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বটম লেস বাসকেট (তলা বিহীন ঝুঁড়ি) বলেছিলেন, সেই আমেরিকা বললো যে, বাংলাদেশ এখন একটা সম্ভাবনাময় দেশ । এসব কথাগুলো আমাদের মনে রাখতে হবে, জানতে হবে বার বার।
খালেদা জিয়ার আমলের সংস্কার তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম অব গভর্নমেন্টকে পার্লামেন্টারি ফর্ম অব গভর্নমেন্টে নিয়ে গেলেন। এখানে যারা বসে আছেন তারা দেশনেত্রীর সঙ্গে লড়াই করেছেন রাস্তায়, জেল খেটেছেন একইভাবে স্বৈরাচারকে দূর করার জন্য। আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া, আমরা কেয়ারটেকার সরকার প্রথমে মানিনি, পরে যখন উনি দেখলেন এটা মানলে দেশের মানুষের উপকার হবে, গণতন্ত্র একটা শক্তিশালী পথ পাবে, ভিত্তি পাবে তিনি সেটা মেনে নিয়ে কেয়ারটেকার সরকারকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করলেন সংসদের মাধ্যমে। যার ফলে ওই সরকারের অধীনে তিনটা নির্বাচন হয়েছে যে নির্বাচনগুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠেনি, মানুষের ভোটের অধিকার তা নিশ্চিত করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুদের বেড়ে ওঠার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জনমুখী করা এই সবই কিন্তু সংস্কারের মধ্যে আমাদের নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দিয়ে শুরু। সুতরাং সংস্কারতো আমাদের, বিএনপির। সংস্কারকে আমরা ভয় পাই নাই, আমরা সংস্কারকে স্বাগত জানাই।
সংস্কারের নামে নতুন নতুন চিন্তাভাবনাই সমস্যা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সমস্যাটা ওই জায়গায় হয়, যখন দেখি যে, নতুন নতুন চিন্তা আসছে। সেই চিন্তার সাথে আমাদের দেশ-জাতি পরিচিত নয়। এ ব্যাপারে আমি কমেন্ট করব না। একটা কমেন্ট করতে চাই, এই যে পিআর বা সংখ্যানুপাতিক হারে প্রতিনিধি নির্বাচন নিম্ন কক্ষে, এটা (পিআর) আমাদের দেশের মানুষ বোঝেই না। মানুষ বলে পিআর কী জিনিস ভাই? যারা এখনো ইভিএমে ভোট দেয়া বোঝে না, যার ফলে ইভিএমে ভোট দেয় না, তারা পিআর বুঝবে কী করে? এই চিন্তাভাবনা থেকে দূরে সরে যেতে হবে। দুঃখজনক হলো যে, এটাকে আমাদের দেশের দুই-একটা রাজনৈতিক দল প্রোমোট করে। প্রোমোট না পণ করে বসে আছে যে, এটা না হলে নির্বাচনে যাবো না। এখন কী বলব বলেন?
অন্তবর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এ দেশের মানুষ যেটাতে অভ্যস্ত সেই ভোটের ব্যবস্থা করুন, তার প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করুন, জনগণের প্রতিনিধি থাকে সেই পার্লামেন্টের নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন তাহলেই সমস্যাগুলো সমাধান হবে, না হলে হবে না। আমরা খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই, অবিলম্বে সংস্কারগুলো শেষ করুন, অবিলম্বে জুলাই সনদ ঘোষণা করুন। আর দয়া করে নির্বাচনের যে তারিখটা নির্ধারণ করেছেন আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে বৈঠকে বসে যেটাকে জাতি অনুপ্রাণিত হয়েছে, আশান্বিত হয়েছে সেই সময়টাতে নির্বাচন দিন, মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিন।
শিশু একাডেমি সরিয়ে নেয়া প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘ আজকে খুব কষ্ট পাই যখন শুনি শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত শিশু একাডেমিকে তার এখনকার যে জায়গায় ভবন আছে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হবে। আমি বিবৃতি দিয়েছি, আমি আজকে এই আলোচনা সভা থেকে আবার অনুরোধ করবো, আমি শুনেছি এটা নাকি হাইকোর্টের জায়গা, যারই জায়গা হোক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সকলের মতামত নিয়ে সেদিন আমাদের শিশুদের বিকশিত করবার জন্য এই শিশু একাডেমি স্থাপন করেছিলেন। এখন সারা বাংলাদেশেই শিশু একাডেমির শাখা আছে। প্রয়াত শফিউল বারী বাবু ‘একজন বিরল প্রতিভার অধিকারী’ নেতা ছিলেন উল্লেখ করে তার স্মরণে একটি ফাউন্ডেশন গঠনের পরামর্শ দেন বিএনপি মহাসচিব।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২৮ জুলাই মারা যান স্বেচ্ছাসেবক দলের তৎকালীন সভাপতি শফিউল বারী বাবু। প্রয়াত শফিউল বারী বাবু স্মৃতি পরিষদের সভাপতি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ছাত্রদলের সাবেক নেতা আসাদুজ্জামান রিপন, আমান উল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, তাহসিনা রুশদীর লুনা (ইলিয়াস আলীর স্ত্রী), ফজলুল হক মিলন, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, কামরুজ্জামান রতন, এবিএম মোশারফ হোসেন, মীর সরাফত আলী সপু, হেলেন জেরিন খান, হারুনুর রশীদ, আমীরুল ইসলাম খান আলীম, এসএম জিলানি, মোস্তাফিজুর রহমান, হাবিবুর রশিদ হাবিব, সাইফ মাহমুদ জুয়েল, প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর বড় ভাই সাইয়িদুল বারী মির্জা, সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমেদ প্রমুখ।




