নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার শঙ্কা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের বাস্তবতা যেন পুরোনো আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করছে। চোরাগোপ্তা হামলা, খুনোখুনি, ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ—এসব ঘটনার মধ্যেই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে এগোচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার নতুন নীতিমালা। সব মিলিয়ে নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন এখন আর কেবল আশঙ্কা নয়, গভীর উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কঠিন পরীক্ষা। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল ভোটের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোর দেওয়া এবং বৈধ অস্ত্র থানায় জমা নেওয়া। এর উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—ভোটার, প্রার্থী ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় অস্ত্রের উপস্থিতি যে পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে, সেটি রাষ্ট্রযন্ত্রও স্বীকার করত।
কিন্তু এবার সেই চর্চা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে নির্বাচনের সময়েও নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং দেহরক্ষী দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। শুধু তা–ই নয়, আগের লাইসেন্সধারীরাও অস্ত্র জমা দিতে বাধ্য হচ্ছেন না। প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত কি নিরাপত্তা বাড়াবে, নাকি অনিশ্চয়তা আরও গভীর করবে?
বাস্তবতা হলো, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। পুলিশের লুণ্ঠিত এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। থানায় হামলা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপদ নন। এমন প্রেক্ষাপটে অস্ত্রের বিস্তার কি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে? নাকি রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলবে?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যক্তিগত অস্ত্র থাকলেই ব্যক্তি নিরাপদ থাকেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতে যাঁরা রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই বৈধ অস্ত্র ছিল। রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল বা পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মতো উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে অস্ত্রের উপস্থিতি কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। ভোটের মাঠে অস্ত্র মানেই ভোটারের মনে ভয়—আর ভয় মানেই গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণে ভাটা।
নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং কঠোর অবস্থানের কথা বলছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি দ্বৈত বার্তা দিচ্ছে। একদিকে বলা হচ্ছে সহিংসতা দমন হবে, অন্যদিকে অস্ত্রের বৈধতা বাড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কি অস্ত্রের শক্তির ওপর ভর করেই নির্বাচন নিরাপদ করতে চায়?
গণতন্ত্রের শক্তি আসে ভোটারের আস্থা থেকে, অস্ত্র থেকে নয়। কয়েকজন প্রার্থী বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের মতো মহাআয়োজন সফল হয় না। নিরাপত্তার মূল পরীক্ষাটি হয় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে সাধারণ মানুষের মনে। সেখানে যদি ভয় কাজ করে, তাহলে সব প্রশাসনিক আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট দূর করা। তার জন্য প্রয়োজন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি, দাগি সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা। নির্বাচনকে উৎসবের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে—নিরাপত্তার একমাত্র ভরসা আইন ও ন্যায়বিচার, আগ্নেয়াস্ত্র নয়।
নির্বাচনের মাঠে অস্ত্রের উপস্থিতি স্বস্তি নয়, বরং আতঙ্কের বার্তা দেয়। এই সত্য অনুধাবন করেই নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। না হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে হয়তো আমরা গণতন্ত্রকেই আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেব।




