বিশ্বের লাখ লাখ মুসলিম যখন সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন গাজার ফিলিস্তিনিরা আরও একবার ইসলামের অন্যতম এই প্রধান স্তম্ভ পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন। রাফাহ সীমান্ত ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকায় গাজাবাসীর আধ্যাত্মিক নবজাগরণ আর ইবাদতের এই পথটি এখন অবরুদ্ধ।
বছরের পর বছর ধরে গাজার ফিলিস্তিনিরা এই পবিত্র সফর থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হজ এমন এক ইবাদত যা শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম মুসলিমদের জন্য জীবনে অন্তত একবার পালন করা ফরজ। কিন্তু অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য সেই সক্ষমতা থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমান্ত আর যুদ্ধ।
গাজার ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা সালওয়া আকিলা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, হজের টাকা জমাতে আমার পাঁচ বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু যুদ্ধ এসে সবকিছু ওলটপালট করে দিল। জমানো সেই সব টাকা এখন বাস্তুচ্যুতি আর দুবেলা খাবারের পেছনে খরচ হয়ে যাচ্ছে।
সালওয়া ও তার স্বামী ২০২৪ সালে হজ করার অনুমতি পেয়েছিলেন। বছরের পর বছর তারা পবিত্র কাবার সামনে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন তারা নিছক বেঁচে থাকার লড়াই করছেন।
গাজায় যারা হজ ও ওমরাহ সেবা প্রদান করতেন, তারা এখন চরম সংকটে। অনেক ট্রাভেল এজেন্সি তাদের ব্যবসা হারিয়েছে, কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে গেছেন। ইসরায়েলি আগ্রাসন গাজাবাসীকে শুধু খাবার ও ওষুধ থেকেই বঞ্চিত করছে না, বরং তাদের ধর্মীয় মর্যাদা ও মানসিক প্রশান্তির সুযোগগুলোও কেড়ে নিচ্ছে।
বন্ধুর পাঠানো মক্কার ছবি দেখে গাজার এক বাসিন্দা বলেন, আমি আশা করি কোনো একদিন আমাদেরও সুযোগ আসবে। এই ছবিগুলো যেমন আবেগঘন, তেমনি আমাদের বঞ্চনার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ব্যথিত করে। বছরের পর বছর পৈশাচিক বোমাবর্ষণের পর গাজাবাসীর জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আধ্যাত্মিক আরোগ্য, যা হজ থেকে পাওয়া সম্ভব ছিল।
গাজার অনেকেই হজের স্বপ্ন দেখতে দেখতে বৃদ্ধ হয়েছেন, তারা এখন শারীরিকভাবে অক্ষমও হয়ে পড়ছেন। অনেকের জন্য এই সফর এখন আর নিরাপদ নয়। বাইরে থেকে মনে হতে পারে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে হজ করা তো জরুরি নয় এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা তেমন কোনো জরুরি সমস্যা নয়, কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে গাজাবাসীরা হজকে তাদের মৌলিক অধিকার মনে করেন। তারা কোনো সাহায্য বা খাবার চাচ্ছেন না, বরং চাচ্ছেন শুধু একটি খোলা পথ, যা দিয়ে নিরাপদে গিয়ে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করে ঘরে ফিরতে পারবেন।
হজের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিরা এবার টানা তৃতীয় বছরের মতো ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ কোরবানি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। বাজারে পশু নেই, থাকলেও আকাশচুম্বী দাম আর অর্থনৈতিক ধস সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
প্রতি বছর হজের অপেক্ষায় থাকা তালিকা থেকে অনেক নাম মুছে যায়। কারণ সেই পবিত্র ভূমিতে পা রাখার আগেই তাদের মৃত্যু হয়। তবুও চরম প্রতিকূলতার মাঝেও ফিলিস্তিনিরা তাদের সামান্য সঞ্চয়টুকু ধরে রাখছেন—এই আশায় যে, আগামী বছর হয়তো হজের স্বপ্ন পূরণ হবে।
মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত ইতালিতে বসবাসরত ফিলিস্তিনি লেখক সারা আওয়াদের কলাম থেকে




