সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হলেও প্রতি দুই বছর অন্তর এর নির্বাচন ঘিরে এক চেনা রাজনৈতিক সমীকরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে। বিশেষ করে জামায়াত সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীদের সুপরিকল্পিত কৌশল ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রচেষ্টা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা বিদ্যমান।
১. প্রশাসনিক ও নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রণ :
বর্তমান কমিটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে শুরুতেই নির্বাচন কমিশন গঠনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই ভাবে অভিযোগ রয়েছে যে, জুলাই ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের সুযোগে বর্তমান জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে প্রশাসন ও পোলিং অফিসার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই সংগঠনের অনুসারীদের বসানো হয়েছে। এর ফলে নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকেই নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে রাখার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়।
২. ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল ও তথ্য গোপন :
কেমুসাসের কমিটিতে বৈচিত্র্য দেখানোর জন্য বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে রাখা হলেও, অভিযোগ আছে যে তাদের অনেকেই কার্যত জামায়াতের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যশীল, বা নমনীয়। এছাড়া নির্বাচনের প্রচার এমনভাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয় যাতে সাধারণ সদস্য বা বাইরের কেউ খুব বেশি সক্রিয় হওয়ার সুযোগ না পায়। পার্লামেন্টগুলোতে স্বৈরশাসকরা যেমন গৃহপালিত বিরোধী দল রাখে, তেমনি কেমুসাসেও কিছু গৃহপালিত ভিন্ন মতের লোক তারা রাখেন দয়া করে।
৩. মনোনয়ন ফর্ম ও মব কালচার :
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক অন্যদের শুরুতেই নিরুৎসাহিত করা হয়। মনোনয়ন ফর্মে রাখা হয় নানা জটিল শর্ত, যাতে সামান্য ভুলে প্রার্থিতা বাতিল করা যায়। এছাড়া বিশেষ ‘মব’ বা প্রভাব খাটিয়ে অন্যদের মনোনয়ন ফর্ম সংগ্রহে বাধা দেওয়া এবং একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা হয়।
৪. মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও গুজবের রাজনীতি :
প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে সুপরিকল্পিত গুজব ছড়ানো হয়। নিজেদের পাল্লা ভারী আর অন্যদের ভোট কম—এমন প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ প্রার্থীদের আপস করতে বাধ্য করা হয়। এই ভীতিকর ও অনিশ্চিত পরিবেশে অনেকেই শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের সাহস হারিয়ে ফেলেন।
৫. সমঝোতার নামে ‘সময় ক্ষেপণ’ কৌশল :
নির্বাচনের আগমুহূর্তে শুরু হয় তথাকথিত সমঝোতা বৈঠক। কৌশলে তৃতীয় পক্ষকে সামনে এনে আলোচনা দীর্ঘায়িত করা হয়। এর ফলে যারা আগে প্রতিশ্রুতি পেয়ে ফর্ম কেনা থেকে বিরত ছিলেন, তারা দৃশ্যপট থেকে ছিটকে পড়েন। দীর্ঘ সময় ক্ষেপণের পর যখন সমঝোতা হয়, তখন প্রতিপক্ষ দলগুলো অপ্রস্তুত অবস্থায় বাধ্য হয়ে শর্ত মেনে নেয়। তবে যারা জামায়াতের কৌশল বুঝে তারা এই ধোঁকায় আটকে না।
৬. করপোরেট ধাঁচের সাংগঠনিক কাঠামো :
সমালোচকরা এই পুরো প্রক্রিয়াকে ‘মুনাফিকি’ বা প্রতারণা বলে অভিহিত করলেও, একটি সুসংগঠিত বা করপোরেট ধাঁচের সংগঠন হওয়ায় জামায়াত এসবে বিচলিত হয় না। তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো যে, নির্বাচনের পর সমালোচনাকারীদের আবারও পরবর্তী নির্বাচনের আগে নিজেদের জোটে টেনে নিতে তারা সক্ষম হয়।
৭. শেষ কথা :
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে সমঝতার নামে যে খেলা খেলছে জামায়াত, তা দেখে আমার কাছে বিষয়গুলো বারবার স্মরণ হচ্ছে। জামায়াতের এই কৌশল বুঝলে বাকী দলগুলো নিজকে রক্ষা করতে পারবে, নতুবা নির্বাচনের পর গালি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না। আর এই কৌশলে ধরা খেলে বেশি ক্ষতি হবে ইসলামি আন্দোলন ও দুই খেলাফত মজলিসের।




