দেশে বন্ধ হয়ে পড়া সব কলকারখানা ধাপে ধাপে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সরকার গঠনের ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীরকে নিয়ে বৈঠক করে কোথায় কোথায় কারখানা বন্ধ আছে এবং কেন বন্ধ হয়েছে, তা চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব কারখানা পর্যায়ক্রমে চালু করে বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
শনিবার (২ মে) দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন কারখানা স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এতে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে থাকা বিদেশি শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল খনন কর্মসূচি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বাসিয়া নদী পুনঃখনন শেষে দুই তীরে ৫০ হাজার গাছ লাগানো হবে। এতে স্থানীয় মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবেন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।
তিনি বলেন, বাসিয়া নদীর পুনঃখনন শেষ হলে সরাসরি প্রায় ৮০ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। পরোক্ষভাবে উপকার পাবেন আরও অন্তত দেড় লাখ মানুষ। এতে বছরে অতিরিক্ত ৭ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশের ৬০ জেলায় খাল খনন কার্যক্রম চলছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষিঋণ সুবিধা পাবেন। ইতিমধ্যে ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় নেতাদের জন্য ভাতা চালু করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘খাল কাটা কর্মসূচি’র আওতায় সর্বশেষ এই নদী খনন করেছিলেন। প্রায় ৪৭ বছর পর আবারও নদীটি পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাসিয়া নদী ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হবে। এতে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ ও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার প্রায় ৯০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নদীটি দেড় থেকে দুই মিটার গভীর করা হবে। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ করেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এর আগে সিলেটে এসে নগরের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে নগর ভবনে সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিলেট থেকে লন্ডনে যেতে যেখানে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে সড়কপথে ঢাকায় যেতে প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত ১১টি জটিলতা ইতিমধ্যে দূর করা হয়েছে এবং দ্রুত কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রেল যোগাযোগ উন্নয়নের কথাও তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিলেটে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ২০০ শয্যার একটি হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে। পাশাপাশি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ২০০-তে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যাঁদের ৮০ শতাংশ নারী। তাঁরা গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন হলে বন্ধ কারখানাগুলো বেসরকারি খাতে দিয়ে চালু করা হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিলেটের আইটি পার্ক সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভোকেশনাল প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো আধুনিকায়ন করা হবে।
নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার অভাবেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। খাল খননের মাধ্যমে এই পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।
নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নদীতে প্লাস্টিক জমে পানি দূষিত হচ্ছে। এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড চালুর পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলায় আগ্রহী করতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য দেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জি কে গউছ এবং সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার।




