ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বর্তমানে নিজের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সংকটের মুখে। তাঁর মন্ত্রিসভাই এখন একটি মৌলিক প্রশ্নে বিভক্ত—তিনি কি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন, নাকি সরে দাঁড়াবেন?
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এমন বিভক্তি দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। হয় ভিন্নমত পোষণকারী মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে হবে কিংবা তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হবে, নয়তো শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকেই বিদায় নিতে হতে পারে।
সোমবার রাতে মন্ত্রীরা স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানে তাঁকে নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়। কেউ তাঁকে লড়াই চালিয়ে যেতে বলেন, কেউ দায়িত্ব ছাড়ার সময়সূচি নির্ধারণের কথা তোলেন। আবার কেউ বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে সহায়তা করার চেষ্টা করেন।
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এখন যেন বাঁধভাঙা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একের পর এক এমপি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থার কথা জানাচ্ছেন। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের পর থেকেই ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য সমালোচনার ঢল নামে।
একজন লেবার এমপি বিবিসিকে বলেন, ভাষণটি ছিল “অবিশ্বাস্য রকম বাজে”। সংক্ষিপ্ত হলেও মন্তব্যটি ছিল অত্যন্ত কঠোর। পরে স্টারমারের দলীয় সহকর্মীদের কাছ থেকে যে তীব্র সমালোচনা আসে, সেটির যেন আগাম ইঙ্গিত ছিল এ মন্তব্যে।
অনেক আইনপ্রণেতার ধারণা, স্টারমার বহু ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য নন। এমন এক সময়ে এ সংকট তৈরি হয়েছে, যখন লেবার পার্টি ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকের উত্থান ঠেকানোর কৌশল খুঁজছে।
তবে এমন অনেক লেবার এমপিও আছেন, যাঁরা বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আতঙ্কিত। তাঁরা প্রকাশ্যে দলের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য হলেও ভেতরে ভেতরে চাইছিলেন, যেন এমন পরিস্থিতি না আসে।
একজন এমপি বলেন, “আমরা অনেকেই আতঙ্ক নিয়ে পরিস্থিতি দেখছি। একদিকে যুদ্ধ, ইরান পরিস্থিতির কারণে চাপে থাকা অর্থনীতি, বাজারে সরকারি বন্ডের অস্থিরতা—এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা হারানো খুবই বিপজ্জনক হতে পারে।”
স্টারমার নিজে পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন? সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন—এমন কয়েকজনের সঙ্গে বিবিসির এই প্রতিনিধি কথা বলেছেন। তাঁদের ভাষ্য, স্টারমার এখনো দায়িত্বে থাকার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর বিশ্বাস, দীর্ঘ নেতৃত্ব সংকট শুরু হলে দল ও দেশ—উভয়ই ঝুঁকিতে পড়বে।
স্টারমারের এক ঘনিষ্ঠজনের ভাষায়, এতে এমন একজন নতুন নেতা আসতে পারেন, যাঁর “জনসমর্থনের ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ” হবে। অর্থাৎ স্টারমারের মতো তাঁর উত্তরসূরি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসবেন না।
তবে এটাও সত্য, স্টারমারের সামনে এখন রাজনৈতিক সমীকরণ ও দলীয় মনোভাব—দুইই ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে উঠছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ এক মন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, “পরিস্থিতি স্পষ্টতই ভালো নয়।”
এরই মধ্যে লেবার পার্টির ভেতরে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের সমর্থকেরা একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছেন। বর্তমান সংকটের দায় কার—তা নিয়েও শুরু হয়েছে দোষারোপ।
আজ মঙ্গলবার স্টারমারের জন্য অপেক্ষা করছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর ও কঠিন একটি দিন। দিনের শুরুতেই তাঁকে অংশ নিতে হবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার বৈঠকে।
সেই ঐতিহাসিক টেবিল ঘিরে বসবেন স্টারমারের নিজের পছন্দে গড়া শীর্ষ সহকর্মীরা, যাঁদের মধ্যেই এখন মতভেদ—তাঁদের নেতা আর কত দিন দায়িত্বে থাকবেন।
শেষ কথা
চার বছর আগে এ সপ্তাহেই বিবিসির এই প্রতিনিধি রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই চার বছরে তিনি চারজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দেখেছেন—বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক ও স্যার কিয়ার স্টারমার।
বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার গভীরতা বোঝাতে তিনি বলেন, “২০০৭ সালে গর্ডন ব্রাউন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় আমার বয়স ছিল ২৭ বছর। তার আগে পুরো জীবনে আমি দেখেছি মাত্র তিনজন প্রধানমন্ত্রী—মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর ও টনি ব্লেয়ার।”
তিনি আরও বলেন, “এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রীর বিদায় যেন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় ফেরা—কোনোটিই আর সেই বাস্তবতা থেকে সুরক্ষা দিতে পারছে না।”




