গাজার ধ্বংসযজ্ঞ ও মৃত্যুর দৃশ্যের পর এবার আনন্দের ছবি, এক বিরল স্বস্তি। বৃহস্পতিবার বিশ্বের প্রায় সকল টেলিভিশন পর্দায় একই দৃশ্য দেখা গিয়েছে— এক পাশে ইসরায়েলিদের উল্লাস, অন্য পাশে গাজার মানুষের উচ্ছ্বাস। দুই দৃশ্য যেন একে অন্যের প্রতিবিম্ব। যুদ্ধ থামানোর এই মুহূর্তটি সবাই বহুদিন ধরে চেয়েছিল।
তবে এ দৃশ্য নতুন নয়। জানুয়ারিতেও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছিল উল্লাসের মধ্য দিয়ে, কিন্তু মার্চে ইসরায়েল চুক্তি ভেঙে আবার হামলা শুরু করে। তাই এবারও সংশয় রয়ে গেছে, তবু অভিজ্ঞ বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তি কিছুটা বেশি টেকসই মনে হচ্ছে।
কে পেল কৃতিত্ব?
সাধারণত এমন অগ্রগতি দুই পক্ষের সমঝোতার ফল। প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হলেও বাস্তবে প্রধান পরিবর্তন এসেছে ইসরায়েলের অবস্থানে। হামাস বরাবরই বলেছে, তারা বন্দি মুক্তি দেবে যদি ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে এবং যুদ্ধ সমাপ্ত করে। অবশেষে হামাসের দাবি মেনেই যুদ্ধের ইতি টানতে হচ্ছে ইসরায়েলকে।
হামাসের বড় কোনো নীতিগত ছাড়ের প্রমাণ নেই। ট্রাম্পের ২০ দফার পরিকল্পনায় সংগঠনের অস্ত্র সমর্পণের কথা থাকলেও, বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে তার উল্লেখ নেই।
ইসরায়েলের অবস্থান কিন্তু নাটকীয়ভাবে পাল্টেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘে বলেছিলেন, হামাস সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। এখন তিনি হামাস টিকে থাকার শর্তে চুক্তি মেনে নিয়েছেন।
কেন নরম হলেন নেতানিয়াহু?
এখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা স্পষ্ট। হোয়াইট হাউসের পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করে তিনি নেতানিয়াহুকে জানিয়ে দেন, সময় শেষ ফুরিয়ে গেছে। অন্য সবার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলায় নেতানিয়াহু কার্যত ট্রাম্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। তাই ট্রাম্পকে বলতেই হলো, ‘ইসরায়েল গোটা বিশ্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে না।’
বিশ্লেষকদের মতে, ৯ সেপ্টেম্বর দোহায় হামাসের আলোচক দলের ওপর ইসরায়েলের ব্যর্থ হামলার পর ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। সেই অভিযান ছিল এমন এক দেশের মাটিতে, যে দেশের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও আর্থিক স্বার্থ জড়িত। এই ‘অপমান’ই তাঁকে সিদ্ধান্তে অনড় করে।
তাছাড়া, ইসরায়েলের রাস্তায় যুদ্ধবিরতির দাবিতে জনগণের বিক্ষোভ, গাজার ধ্বংসে বিশ্বব্যাপী নিন্দা, সব মিলিয়ে ট্রাম্প বুঝেছিলেন- এখনই উদ্যোগ নিলে কূটনৈতিক সাফল্য তাঁর নামে যাবে। আর নোবেল শান্তি পুরস্কারের স্বপ্ন— যা তিনি প্রকাশ্যেই পোষণ করেন, তাও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।

সাধারণত এমন অগ্রগতি দুই পক্ষের সমঝোতার ফল। প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হলেও বাস্তবে প্রধান পরিবর্তন এসেছে ইসরায়েলের অবস্থানে। হামাস বরাবরই বলেছে, তারা বন্দি মুক্তি দেবে যদি ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে এবং যুদ্ধ সমাপ্ত করে। অবশেষে হামাসের দাবি মেনেই যুদ্ধের ইতি টানতে হচ্ছে ইসরায়েলকে।
নায়ক না বিলম্বিত মধ্যস্থতাকারী?
হ্যাঁ, ট্রাম্প কঠোর কূটনীতি ও প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধ থামাতে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও ‘আর্ম টুইস্টিং’-এর ক্ষমতা এখানে কার্যকর হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি চাইলে এত আগেই এটা করতে পারতেন।
হোয়াইট হাউসে ফেরার দিন থেকেই মার্চের আগের যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। তখন নেতানিয়াহু সেটি ভেঙে ফেললেও ট্রাম্প বাধা দেননি। বরং নীরবে অনুমোদন দিয়েছিলেন, আর তাতেই শুরু হয় যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। তাঁর তখনই থামানোর ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তিনি ব্যবহার করেননি।
ট্রাম্প এখনো নোবেল পাননি, কিন্তু যদি সত্যিই চান, তাঁকে এই চুক্তির পরবর্তী ধাপগুলোতেও সক্রিয় থাকতে হবে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মহল ইতিমধ্যেই বলেছে, ‘দ্বিতীয় ধাপ বলে কিছু নেই।’ ট্রাম্প যদি সত্যিই শান্তির পুরস্কার চান, তাঁকে চাপ বজায় রাখতে হবে, যাতে ইসরায়েল প্রতিশ্রুতির বাইরে না যায়।
নেতানিয়াহুর দায় আরও গভীর
২০২৪ সালের জুনেই প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এতে ইসরায়েলের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্বল হয়েছে, বন্দিদের দুর্ভোগ বেড়েছে, এবং গাজার মানবিক বিপর্যয় অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক মাইকেল মিলস্টেইনের ভাষায়, ‘আমরা অনেক দূর ঘুরে আবার একই জায়গায় ফিরে এসেছি, এ এক বিপর্যয়।’
এখন কী?
ট্রাম্প এখনো নোবেল পাননি, কিন্তু যদি সত্যিই চান, তাঁকে এই চুক্তির পরবর্তী ধাপগুলোতেও সক্রিয় থাকতে হবে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মহল ইতিমধ্যেই বলেছে, ‘দ্বিতীয় ধাপ বলে কিছু নেই।’ ট্রাম্প যদি সত্যিই শান্তির পুরস্কার চান, তাঁকে চাপ বজায় রাখতে হবে, যাতে ইসরায়েল প্রতিশ্রুতির বাইরে না যায়।
গাজার যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্প কৃতিত্বের দাবি তুলতেই পারেন। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে, শুধু কাজের জন্য নয়, তা করতে এত দেরি করার কারণের জন্যও।




