রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে চলমান ‘শাপলার শহীদচিত্র’ প্রদর্শনীতে শাপলা হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা ও আল্লামা আহমদ শফীর খোলা চিঠি প্রদর্শন নিষিদ্ধের অভিযোগ উঠে। মঙ্গলবার (৫ মে) সন্ধ্যায় খেলাফাত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক নিজের ফেসবুক একাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে আগামীকাল (৬ মে) তা প্রদর্শনের অনুমতি পাওয়ায় নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মামুনুল হক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, আজ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত ‘শাপলা শহীদচিত্র’ প্রদর্শনী-তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। প্রদর্শনীর আয়োজকদের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কর্ণারে ২০১৩ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফী-এর খোলা চিঠি এবং ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। এই দাবিগুলোর প্রেক্ষিতেই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি জানান, তবে উদ্বোধনের আগে যাদুঘরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ খোলা চিঠি ও ১৩ দফা দাবি বিষয়ে প্রক্রিয়াগত কিছু আপত্তির কথা জানান। কিন্তু বিষয়টি আয়োজকদের কাছে যথাযথ ভাবে উপস্থাপিত হয়নি। উপস্থাপনের ধরন থেকে বিষয়টি সম্পর্কে তাদের আপত্তি আছে বলে মনে হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই আমি তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। এখন কর্তৃপক্ষীয় যথাযথ ব্যাখ্যা সামনে আসায় এবং আগামীকাল তা প্রদর্শিত হওয়ার ব্যবস্থা হওয়ায় আমি আমার পূর্বের বক্তব্য সরিয়ে নিলাম।
এর আগে সন্ধ্যায় তিনি পৃথম ফেসবুক পোস্টে লেখেন ‘জাতীয় যাদুঘরে চলমান শাপলার শহীদচিত্র প্রদর্শনীতে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা এবং আল্লামা আহমদ শফীর খোলা চিঠি প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। স্বাগত নতুন ফ্যাসিবাদ’।
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে হেফাজতের ১৩ দফা এবং আল্লামা আহমদ শফীর খোলা চিঠি। সেই মহাসমাবেশে তৎকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে হত্যাযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ উঠে। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ কর্তৃক ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও নাস্তিক ব্লগারদের ক্রমাগত ইসলাম ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে ১৩ বছর আগে এই দিনে মহাসমাবেশ করে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ নামের অরাজনৈতিক সংগঠন।
হেফাজতে ইসলামের সেই আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল: ১. সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা। ২. আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননাকারীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন পাস করা। ৩. ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের শাস্তির আওতায় আনা। ৪.
আলেম-ওলামা ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা বন্ধ করা। ৫. গ্রেফতারকৃত আলেমদের মুক্তি দেওয়া। ৬. মসজিদ ও ধর্মীয় প্রোগ্রামের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া। ৭. কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করা। ৮. বেহায়াপনা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করা। ৯. ঢাকা শহরকে মূর্তির শহরে রূপান্তর বন্ধ করা। ১০. ইসলামবিরোধী নারী নীতি বাতিল করা। ১১. কওমি মাদ্রাসা ও আলেমদের হুমকির মুখে ফেলা বন্ধ করা। ১২. গণমাধ্যমে ইসলামের অপব্যাখ্যা বন্ধ করা। ১৩. পার্বত্য অঞ্চলে খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মান্তকরণ বন্ধ করা।
এর পূর্বে তৎকালীন হেফাজত ইসলামের আমির আল্লামা আহমদ শফী তার খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘‘জাতির আবেগ-অনুভূতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নাস্তিক ও ইসলামের দুশমনরা তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করে ইসলামের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। দেশব্যাপী বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, ব্যভিচার ছড়িয়ে দিয়ে মুসলমানদের ঈমান-আমল ও সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংসে নতুন আরেক ষড়যন্ত্র শুরু করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হাজারবার হোক, তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে আলেমসমাজ, মাদ্রাসা, দাড়ি-টুপি, পর্দা তথা দ্বীন-ইসলামের বিরুদ্ধে যে কোন ষড়যন্ত্রে এদেশের আলেমসমাজ ও তৌহিদী জনতা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না।’ তিনি সরকারের প্রতি অবিলম্বে ইসলাম, মুসলমান, নামাযী, দাড়ি-টুপিধারীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সকল অপতৎপরতা বন্ধের আহবান জানান।’’
চিঠির শেষে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘দেশের সর্বস্তরের মুমিন – মুসলমান জনগণের উদ্দেশে আমরা বলতে চাই শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে বিচার না করে; বিশেষ কোনো দল / গোষ্ঠীর পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সরলীকরণে না গিয়ে, এর অর্ন্তর্নিহিত রূপ ও চরিত্র অনুধাবন করুন। শাহবাগ চত্বরের কথিত জাগরণ মঞ্চের বিগত দুই সপ্তাহের কার্যক্রমকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেছে-এটা মোটেও স্বাধীনতার স্বপক্ষ-বিপক্ষের লড়াই নয়। এবং দামতের উর্ধ্বে উঠে নিজের ঈমান, আক্বীদা-বিশ্বাস ও ইসলামের প্রতীকসমূহের হেফাজতের পক্ষে সোচ্চার ও জোরালো ভূমিকা রাখুন। নাস্তিক, মুরতাদ ও ইসলামবিরোধী অপশক্তির আস্ফালনের বিরুদ্ধে সারা দেশে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলুন।’’




