ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জাপা) নজিরবিহীন ভরাডুবির মুখে পড়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর এই প্রথম দলটি কোনো আসনে জয় পায়নি। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দলটির কোনো প্রার্থীই এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থান গড়তে পারেননি। দীর্ঘদিনের ঘাঁটি রংপুরও হাতছাড়া হয়েছে।
রংপুর ও নীলফামারীর নয়টি আসনের সবকটিই গেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির দখলে। ওই অঞ্চলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি আসনও পায়নি। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে প্রায় পুরো অঞ্চলেই জামায়াত জোটের উত্থান হয়েছে—যেখানে জাপার পতনের সূচনা, সেখানেই তাদের উত্থান।
শীর্ষ নেতৃত্বের ধাক্কা
জাপা ২০০ আসনে প্রার্থী দিলেও ফলাফল হতাশাজনক। রংপুর–৩ আসনে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় হন। সেখানে জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলাল পান ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট, বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পান ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। জি এম কাদের পান ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট।
গাইবান্ধা–১ আসনে মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী পান প্রায় ৩৪ হাজার ভোট। ওই আসনে জামায়াতের মো. মাজেদুর রহমান পান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট এবং বিএনপির খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী পান ৩৭ হাজার ৯৯৭ ভোট।
বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের পর সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েও জাপা কোনো আসন না পাওয়াকে বিশ্লেষকেরা বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
সম্পর্কের বোঝা?
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থান জাপার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষয় করেছে। ক্ষমতার অংশীদার হলেও দলটি অনেক সময় ‘সহযোগী শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের ভোট জাপার দিকে আসবে—এমন প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। তৃণমূল সংগঠনের দুর্বলতা ও নেতানির্ভর রাজনীতিও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
ভাঙন ও দুর্বলতা
নির্বাচনের আগে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা দল ছাড়েন। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদ আলাদা দল গঠনের ঘোষণা দিলেও প্রতীক–সংক্রান্ত জটিলতায় ভোটে অংশ নিতে পারেননি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর কাকরাইল কার্যালয়ে হামলা–অগ্নিসংযোগ ও দল নিষিদ্ধের দাবিও চাপ বাড়ায়।
এরশাদের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের বিরোধ, সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার বহিষ্কার–ফিরে আসা—সব মিলিয়ে অস্থিরতা বাড়ে। অতীতে জাতীয় পার্টি (জেপি) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি গঠনের মতো বিভাজনও দলটির শক্তি ক্ষয় করেছে। এবারে বিএনপি জোট থেকে বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থের জয় জাপার জন্য প্রতীকী ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অতীতের শক্তি, বর্তমান শূন্যতা
১৯৯১ সালে জাপা ৩৫টি আসন পেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ ভোট অর্জন করেছিল। ১৯৯৬ সালে পায় ৩২টি আসন। ২০০১ সালে তা কমে ১৪, ২০০৮ সালে মহাজোটে থেকে ২৮, ২০১৪ সালে ৩৪, ২০১৮ সালে ২২ এবং ২০২৪ সালে ১১ আসনে নামে। এবারের শূন্য ফল সেই ধারাবাহিক পতনের চূড়ান্ত প্রকাশ।
উত্তরবঙ্গ—রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী—যেখানে লাঙ্গল প্রতীক একসময় শক্ত ভিত্তি গড়েছিল, সেখানেও ভরাডুবি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নির্বাচনী পরাজয় নয়; জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বড় প্রশ্ন।




