টানা দুই দিনের ঝড়-তুফান, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত ও কালবৈশাখীর আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হবিগঞ্জ জেলা-এর সার্বিক পরিস্থিতি। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে হাওর অধ্যুষিত বানিয়াচং উপজেলা, আজমিরীগঞ্জ উপজেলা, লাখাই উপজেলা ও নবীগঞ্জ উপজেলা-এর জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। একইসঙ্গে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে হাওরবাসীর একমাত্র ফসল বোরো ধান।
অবিরাম বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়ার কারণে হাওরাঞ্চলের নিচু জমিতে দ্রুত পানি বৃদ্ধি পেয়ে পাকা বোরো ধান তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। অনেক স্থানে ক্ষেতের ধান পুরোপুরি পানির নিচে চলে গেছে। ফলে কৃষকের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কোমরসমান পানিতে নেমে আধপাকা ধান কেটে তুলছেন, যাতে অন্তত কিছু ফসল রক্ষা করা যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অন্যদিকে হাওরাঞ্চলে পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। পানির কারণে হারভেস্টার মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ফসল কাটতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, গত দুই দিনের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতে হাওরাঞ্চলে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ হাজার ২শ হেক্টর পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় মাত্র ২০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ ফসল এখনো ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এখনো উজানের ঢল নামেনি—কেবল বৃষ্টির পানিতেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, খোয়াই নদী, কুশিয়ারা নদী, সুতাং নদী ও কালনী নদীসহ জেলার সব নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও এখনো কোনো নদী বিপদসীমা অতিক্রম করেনি, তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যে কোনো সময় তা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে দ্রুত বাড়ছে হাওরের পানি। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় শেষ সম্বল রক্ষায় কৃষকেরা কোমরসমান পানিতে নেমে মরিয়া হয়ে ধান কাটছেন। অনেক জায়গায় কাটা ধান নৌকায় করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
হাওরজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য—ডুবন্ত ক্ষেত, পানির ওপর ভাসছে পাকা ধান, আর জীবনের শেষ ভরসা বাঁচাতে কৃষকের নিরন্তর সংগ্রাম। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের ফসলহানির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




