দীর্ঘ ১৫ বছরের আইনি লড়াই আর অপেক্ষার অবসান হলো। সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমায় বাসে অগ্নিসংযোগ ও এক যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত চাঞ্চল্যকর মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম. ইলিয়াস আলী ও অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামানসহ ৩৮ জন নেতাকর্মী।
মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে সিলেটের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল (জেলা ও দায়রা জজ) আদালতের বিচারক মো. শরিফুল ইসলাম এই রায় ঘোষণা করেন।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী এক আইনি জট থেকে মুক্তি পেলেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। তবে যে নিখোঁজ নেতার নাম এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—এম. ইলিয়াস আলী এবং ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনার—তাদের অনুপস্থিতিতেই ঘোষিত হলো এই রায়।
মামলার নথিপত্র এবং স্মৃতি হাতড়ালে ফিরে যেতে হয় ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বরে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচি চলাকালে উত্তাল ছিল সিলেট। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দক্ষিণ সুরমার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বদিকোনা এলাকায় ‘সিলেট-হবিগঞ্জ সুপার এক্সপ্রেস’-এর একটি চলন্ত বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা সেই বাসের ভেতরে আটকা পড়ে অঙ্গার হয়ে যান ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। একই সময় ভাঙচুর করা হয় আরও একটি বাস।
সেই ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে শুরুতে তৈরি হয়েছিল গভীর রহস্য। কোনো স্বজন না আসায় ২০ ডিসেম্বর পুলিশ তাকে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে নগরীর মানিকপীরের গোরস্থানে দাফন করে। কিন্তু দাফনের ১৩ দিন পর ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি জোৎস্না বেগম নামে এক নারী দক্ষিণ সুরমা থানায় এসে লাশের পরিচয় শনাক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, নিহত ব্যক্তি তার স্বামী কাজী নাছির (৭০) এবং তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা শাবনূরের বাবা। পায়ের জুতা, হাতের ঘড়ি আর কোমরের বেল্ট দেখে স্বামীকে শনাক্ত করেছিলেন সেই নারী। ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
গাড়িতে আগুনের ঘটনায় তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ সুরমা থানায় দুটি মামলা হয়েছিল। একটি হত্যা মামলা (এসআই হারুন মজুমদার বাদী হয়ে) এবং অন্যটি দ্রুত বিচার আইনে মামলা (পরিবহন ব্যবসায়ী শাহ নূরুর রহমান বাদী হয়ে)। মামলায় এম. ইলিয়াস আলী ও সামসুজ্জামান জামানসহ ৩৯ জনকে আসামি করা হয় (পরবর্তীতে একজন মারা যাওয়ায় ৩৮ জন)।
মঙ্গলবার আদালতে দীর্ঘ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরা শেষে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। আসামীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাসান রিপন পাটোয়ারী ও অ্যাডভোকেট মসরুর চৌধুরী শওকত জানান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল, যা আজ আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে।
মামলা থেকে খালাস পাওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলী, অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান, অ্যাডভোকেট এটিএম ফয়েজ, নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারসহ আরও অনেকে। রায়ের পর আদালত চত্বরে নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিলেও এম. ইলিয়াস আলী ও দিনারের মতো নেতাদের নিখোঁজ থাকার বেদনা ছায়া ফেলেছিল উপস্থিত সবার মনে।
বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদলেও দীর্ঘ ১৫ বছর পর সত্যের জয় হয়েছে বলে মনে করছেন খালাস পাওয়া আসামিরা ও তাদের আইনজীবীরা।




