বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ঈদসংখ্যার বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিবর্তন আসে। ঈদসংখ্যার বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে শুধু ঈদকেন্দ্রিক থেকে সরে এসে সমাজ, প্রেম, রাজনীতি ও মানবিক সম্পর্কের বিচিত্র গল্পে বিস্তৃত হতে শুরু করে।
বাংলা সাহিত্যে ঈদকে কেন্দ্র করে আলাদাভাবে ঈদসংখ্যা প্রকাশের ইতিহাস খুব নতুন না হলেও খুব প্রাচীনও নয়। ঈদ উপলক্ষে গল্প, কবিতা ও নানা সাহিত্যরচনা প্রকাশিত হলেও ঈদসংখ্যা প্রকাশের সংস্কৃতি মূলত গত শতকের শুরুর দিকে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সে সময় বিভিন্ন সাময়িকীতে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, এমনকি উপন্যাস নিয়েও ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হতো। রচনাগুলোর প্রধান উপজীব্য বিষয় ছিল ঈদ। ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির নানান অনুভূতি কিংবা চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে ঈদসংখ্যাগুলো। মাসিক মোহাম্মদী থেকে শুরু করে সওগাত, আল ইসলাহ, মোসলম ভারত, নওরোজ, বুলবুলসহ অনেক সাময়িকী ঈদসংখ্যা প্রকাশ করত।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান সমাজে সাহিত্যচর্চার একটি নিজস্ব ধারা গড়ে উঠতে থাকে। ঈদ বাঙালি মুসলমান সমাজের সবচেয়ে বড় উৎসব, তাই স্বাভাবিকভাবেই এই উৎসবকে ঘিরে সাহিত্যও রচিত হয়। মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত, আল ইসলাহ, বেগম-এর মতো বেশ কিছু পত্রিকা ঈদ উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে বাঙালি মুসলমান পাঠকদের মধ্যে সাহিত্যের রুচি ও চাহিদা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই সময়ের ঈদসংখ্যাগুলো ছিল মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনায় সিক্ত। কবিতায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, সমাজের ভেদাভেদ ভুলে একতার আহ্বান এবং গল্পে ঈদের আনন্দ ও মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতাই ছিল মুখ্য বিষয়।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ঈদসংখ্যার বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিবর্তন আসে। ঈদসংখ্যার বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে শুধু ঈদকেন্দ্রিক থেকে সরে এসে সমাজ, প্রেম, রাজনীতি ও মানবিক সম্পর্কের বিচিত্র গল্পে বিস্তৃত হতে শুরু করে। বিশেষত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। সাহিত্য থেকে শুরু করে আর্থসামাজিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। পরিবর্তনের ঢেউ বাংলার দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও স্পর্শ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে আঙ্গিকে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ঈদের আনন্দ তখন আর কেবল ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমিত থাকেনি, বরং তা হয়ে ওঠে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের উদযাপনের অংশ।
দীর্ঘসময় ধরে ঈদসংখ্যাগুলো বিখ্যাত লেখকদের লেখার আকর্ষণীয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদসহ অসংখ্য প্রথিতযশা লেখক ঈদসংখ্যায় লিখেছেন। একই সঙ্গে ঈদসংখ্যা নতুন লেখকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশমাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। অনেক নবীন লেখক ঈদসংখ্যায় প্রকাশের সুযোগ পেয়ে পাঠকমহলে পরিচিতি লাভ করেছেন। তবে অতি বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ঈদসংখ্যার সাহিত্যমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। বাণিজ্যিক চাপে এবং ঈদের আগে দ্রুত প্রকাশের তাড়ায় অনেক ঈদসংখ্যায় সাহিত্যের গভীরতা ও গুণগত মান ক্ষুণ্ণ হয়। পরিমাণের দিক থেকে বিশাল হলেও সাহিত্যমানের দিক থেকে কিছু সংশয় থেকেই যায়।
একবিংশ শতাব্দীতে ঈদসংখ্যার বিস্তার কেবল বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই সীমিত থাকেনি, প্রবাসী বাঙালিরাও এই ধারায় যুক্ত হয়েছেন। ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত বাংলামেইল-এর ঈদসংখ্যা তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশাল কলেবরে প্রায় অর্ধশতাধিক লেখকের গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে ভৌগোলিক দূরত্ব বাংলা সাহিত্যের উৎসবকে থামাতে পারেনি।
প্রয়াত কবি দিলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কোমড়-ভাঙ্গার কবিতা, শেখ লুৎফুরের উপন্যাস বিষপিঁপড়া, মোস্তাক আহমাদ দীনের লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ ফকির ইয়াছিনের আত্মপরিভ্রমণ, আহমদ ময়েজের কবিতা অষ্ঠাদশী কন্যাঘোর ও অন্যান্য এবং সাইয়্যিদ মুজাদ্দিদের যুদ্ধ ও সংগীতের মধ্যরেখায় কবিতা ঈদসংখ্যাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাছাড়া অন্যান্য লেখকদের কবিতা, প্রবন্ধ ও স্মৃতিগদ্য মিলিয়ে বাংলামেইলের এই ঈদসংখ্যা পাঠকের মননকে সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করি।




