মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। চিরসবুজ এই বনের বুক চিরে চলে গেছে আঁকাবাঁকা রেললাইন। দুপাশে ঘন অরণ্য আর ছায়াঘেরা পরিবেশের এই মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। কিন্তু এই অপার সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর ‘মৃত্যুফাঁদ’। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইক-ভিউ পাওয়ার নেশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইনে ছবি ও ভিডিও তুলতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানির মতো ঘটনা।
সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটকদের মধ্যে রেললাইনে দাঁড়িয়ে বা বসে ছবি তোলার এক বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ রুটের লাউয়াছড়া বনাঞ্চলে সেলফি তুলতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারান এক শিক্ষার্থী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নিখুঁত একটি ফ্রেমের খোঁজে মগ্ন থাকা ওই শিক্ষার্থী বুঝতেও পারেননি কখন ইঞ্জিনটি তাকে আঘাত করেছে।
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. সাখাওয়াত হোসেন উদ্বেগের সাথে জানান, “রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এখন অনেকের কাছে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা।”
লাউয়াছড়ার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই এখানে বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বনটি ঘন বৃক্ষরাজিতে ঘেরা এবং এর ভেতর দিয়ে যাওয়া রেললাইনটি বেশ আঁকাবাঁকা। ফলে অনেক সময় খুব কাছ থেকে ট্রেন না আসা পর্যন্ত দেখা বা শব্দ শোনা যায় না। বনের শান্ত পরিবেশে ট্রেনের গতিবেগ অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে, ফলে পর্যটকরা সরে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় পান না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘুরতে আসা আব্দুল্লা আল কাফি এর বক্তব্যে উঠে এল এক রূঢ় বাস্তবতা। তিনি বলেন, “অনলাইনে লাইক-ভিউ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় নিরাপত্তার বিষয়টিকে আড়াল করে দেয়। এই ভিউ এত সুন্দর যে ছবি না তুললে মনে হয় ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ।” একই সুর শোনা গেল রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক শেখ মুন্নার কণ্ঠে। তিনি জানান, সবাই ছবি তুলছে দেখে তিনিও পিছিয়ে থাকতে চাননি।
স্থানীয় ট্যুর গাইড সাজু মারছিয়াং জানান, পর্যটকরা প্রায়ই রেলকর্মীদের বা গাইডের সতর্কবার্তাকে তোয়াক্কা করেন না। এমনকি উঁচুতে থাকা রেল সেতুতে উঠে ছবি তুলতে গিয়েও অতীতে দুর্ঘটনার নজির রয়েছে।
মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ জহিরুল হকের মতে, সচেতনতার অভাব, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবই এই সংকটের মূল কারণ। তিনি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সাংবাদিক সালাউদ্দিন শুভ বলেন, “কয়েক সেকেন্ডের রোমাঞ্চ বা একটি ছবির মূল্য কি জীবনের চেয়ে বড়? প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের অধিকার সবার আছে, কিন্তু তা যেন প্রাণ কেড়ে না নেয়।”
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানিয়েছেন, পর্যটন মৌসুমে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রেললাইনে যাতে কেউ ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবস্থান করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ ও বন বিভাগ কাজ করছে।
রেললাইন কোনো বিনোদন কেন্দ্র নয়, এটি একটি সক্রিয় পথ। আপনার একটি অসতর্ক মুহূর্ত কেড়ে নিতে পারে আপনার জীবন এবং স্তব্ধ করে দিতে পারে একটি পরিবারের স্বপ্ন।




