কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে এবারও অস্থিরতার অভিযোগ উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল সংখ্যক কাঁচা চামড়া নষ্ট হওয়া কিংবা সরকার নির্ধারিত দামে বেচাকেনা করতে না পারার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। যদিও চামড়া নিয়ে একটা অপতথ্য বিস্তার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আসরের নামাজের সময় একটা পার্টি এসে সাতশো সত্তর টাকা করে দিতে চাইলো, সন্ধ্যার পর সেই চামড়া চারশো টাকায় বিক্রি করছি।
বিভিন্ন জায়গা থেকে দান হিসেবে পাওয়া কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা এভাবেই জানালেন রাজশাহী হেতেম খা মসজিদের ইমাম। অথচ যে দামে কাঁচা চামড়া এলাকা থেকে সংগ্রহ করেছেন, হাটে এসে তার থেকে দুই-তিনশো টাকা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী। রাজশাহীর এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, আমরা নয়শ, হাজার পঞ্চাশ টাকায় কিনছি, এখন দাম কচ্ছে সাতশ, আটশ। আমাদের লস, চামড়া প্রতি দুইশ একশ নাই। কাঁচা চামড়ার আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মুকুল হোসেন বলছেন, ছয়শো-সাতশো টাকা করে গরুর চামড়া কিনলেও বিক্রি করার জন্য কাস্টমার পাচ্ছি না, বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ।
সন্ধ্যার পরেও ঢাকাসহ অনেক স্থানে রাস্তায় চামড়া পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। কলাবাগানের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলছেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করতে কেউ আসেনি। গেটের পাশেই চামড়া পড়ে ছিল। যদিও, এ বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীই কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, সোমবার পর্যন্ত প্রায় চার লক্ষ পিস কাঁচা চামড়া ট্যানারি স্টেটে ঢুকেছে। শনি, রবিবার থেকে ঢাকার বাইরের চামড়া আসতে শুরু করবে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, চামড়া শিল্পনগরীর ব্যবস্থাপনা ঠিক না হলে, সিইটিপি ঠিকমতো কাজ না করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
এদিকে, মঙ্গলবার বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার আড়ত নাটোরের চকবৈদ্যনাথে পরিদর্শন শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, এ বছর ছাগলের চামড়ার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দাম মানা না হলেও গরুর চামড়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে না। কিছু চামড়া পঁচে গিয়েছে, এটা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ভুলের কারণে, অযাচিত তাদের জ্ঞানের কারণে, এই পঁচা চামড়ার দামও যে পাওয়া যাচ্ছে এটাই তো অনেক কিছু।
চামড়ার বাজারের আংশিক তথ্য দিয়ে মিডিয়ায় রিপোর্ট করে একটা অপতথ্য বিস্তার করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে এবার চামড়া বিক্রি হয়েছে।
চামড়ার দাম নিয়ে এতো অভিযোগ কেন?
কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে নানা জটিলতা তৈরী হওয়ায় প্রতিবছর এলাকা ও চামড়ার প্রকারভেদে দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এবার কোরবানি ঈদের আগে গত ২৬ মে পশুর চামড়ার নির্ধারিত মূল্য জানানো হয়। যেখানে ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে যা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ধার্য করা হয়। এছাড়া ছাগলের লবণযুক্ত চামড়া প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৭ টাকা ও বকরির চামড়া ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও কাঁচা চামড়া নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে এবারও।
এ খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির পশুর চামড়া সাধারণত তিনটি ধাপে হাতবদল হয়। গৃহস্থালি পর্যায় থেকে ব্যবসায়ী বা আড়তদার হয়ে পৌছায় ট্যানারিতে। প্রতিবছরই চামড়ার সরকার নির্ধারিত দাম পাওয়া না পাওয়া নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এক্ষেত্রে মৌসুমি ব্যবসায়ী, চামড়ার মান ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়াসহ নানা বিষয় কারণ হয়ে দাড়ায়। পশু কোরবানির পর কেউ কেউ মসজিদ অথবা মাদরাসায় চামড়া দান করেন। যা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন মসজিদ বা মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। আবার বাসাবাড়িতে গিয়েও পশুর চামড়া কেনেন স্থানীয় অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
প্রাথমিকভাবে মূলত দাম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য আসে বেচাকেনার খুচরা পর্যায়েই। সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করেই অনেকে চামড়া ক্রয় করেন। কাঁচা চামড়ার সংরক্ষণেও থাকে নানা অনিয়ম, উদাসিনতা। যাতে মান নষ্ট হওয়ায় পরবর্তীতে ভালো দাম পায় না বা বিক্রিই হয় না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এর তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষণ ত্রুটির কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০ শতাংশ পশুর চামড়া নষ্ট হয়।
চামড়ার দাম নিয়ে আড়ৎদার ও ট্যানারি মালিকদের মধ্যেও রয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল কাদের বলছেন, ট্যানারি মালিকরা কখনোই সরকারের বেধে দেয়া দামে আমাদের কাছ থেকে চামড়া কিনে নাই এ পর্যন্ত। চামড়া কেনার সময় সবাই মনিটরিং করলেও বিক্রির সময় কেউ খোঁজ রাখে না। এক দেড় মাসের মধ্যে এই চামড়া বিক্রি করতে না পারলে বাধ্য হয়ে ফেলে দিতে হবে তাই বাধ্য হয়ে ট্যানারি মালিকদের দামেই বিক্রি করতে হয় আমাদের। এবার লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়া মান ও রকমভেদে ২৫০ থেকে ৭০০ টাকায় কিনেছেন তারা। এখনো ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কোনও আশ্বাস না পেলেও “সরকারের বেঁধে দেয়া দামে যদি ট্যানারি মালিকরা চামড়া কেনে তাহলে হয়তো একটা লাভ হবে। চট্টগ্রাম মহানগর এবং উপজেলা মিলিয়ে সাড়ে তিন থেকে চার লক্ষ পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহের লক্ষমাত্রা থাকলেও মঙ্গলবাল দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছেন।
বেশি দামে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করলেও পরে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সঠিক দাম না পাওয়ার অভিযোগ করেন নাটোরের চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক হালিম সিদ্দিকী। তিনি জানান, ট্যানারি মালিকরা আমাদের মার্কেটে কতটা আসেন আর কত দাম দেন তার ওপরই নির্ভর করছে ব্যবসা কতটা হবে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, লক্ষমাত্রা অনুযায়ী চামড়া সংগ্রহ করছি আমরা। এবছর অন্তত ৯০ লক্ষ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হবে। যদিও এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জন্য কোনো সুখবর নেই। এক্ষেত্রে শিল্পনগরীর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বাজারে ঠিকমতো দাম না পেলে তার প্রভাব তৃণমূলের ব্যবসায়ীদের ওপরও পড়ে।
সব সমস্যার মূলে সিইটিপি ও কমপ্লায়েন্স
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার বিস্তারের ব্যাপক সুযোগ থাকার পরও এ খাতে তেমন উন্নতি করতে পারেনি বাংলদেশ। বরং সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি কমে এই বাজার সংকুচিত হয়েছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, প্রতি বছরই একটু একটু করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি কমেছে। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে চামড়া রফতানি ৮.২৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১০৭.৬১ মিলিয়ন ডলারে, যা গত অর্থবছরে ছিল ১১৭.২৭ মিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে গড়ে না ওঠায় লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না বাংলাদেশ। যার ফলে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও পণ্য উৎপাদনে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিবেশসম্মত কমপ্লায়েন্সেও যুক্ত হতে পারছে না বাংলাদেশের সিংহভাগ কোম্পানি। যদিও পরিস্থিতির উন্নতির জন্যই ২০১৭ সালে পুরান ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সরিয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়াশিল্প নগরীতে স্থানান্তর করা হয়।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, শিল্প নগরীর ট্যানারিগুলো এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের সক্ষমতা অর্জন করলেও কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার না থাকায় কোনো লাভ হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে কমপ্লায়েন্স না থাকার সুযোগ নিচ্ছে বিদেশি বায়াররা। আমরা তো শুধুমাত্র চায়না নির্ভর বায়ারদের কাছে দরদাম করতেছি। ঈদের আগে তারাও সুযোগটা নিয়ে অনেক কম দামেই চামড়া নিয়ে নেয়।
ব্যবসায়ীরা নিজেরাই ইটিপি তৈরী করছেন না কেনো? এমন প্রশ্নের জবারে মজিবুর রহমান বলছেন, ট্যানারি স্টেটে সিইটিপি থাকার কারণে ইটিপি আমি যদিও করিও সেই বর্জ্যটা আমি কোথায় ফেলবো? কদিন আগেও ট্যানারী পল্লীতে ব্যক্তিগতভাগে বর্জ্য পরিশোধনাগার তৈরির নিয়ম না থাকলেও সম্প্রতি সেই সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে। যাতে কিছু ট্যানারি ইটিপি তৈরির কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, চামড়া শিল্পনগরী ব্যবস্থাপনা ঠিক না হলে, সিইটিপি ঠিকমতো কাজ না করলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। চামড়া শিল্প দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হতে পারতো কিন্তু এটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।
যা বলছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা
মঙ্গলবার বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার আড়ত নাটোরের চকবৈদ্যনাথ পরিদর্শন করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি জানান, কদিনে প্রচুর চামড়া বাজারে সরবরাহ করা হয়। এই সরবরাহটাকে সরকার লবণ দিয়ে সংরক্ষণ উপযোগী করে ডিলে করার চেষ্টা করেছে। যার ফল আলহামদুলিল্লাহ, গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে চামড়া ট্রানজেকশন হচ্ছে। চাহিদা এবং যোগান, যে পরিমাণ চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষিত হয়েছে আজ পর্যন্ত এ সংরক্ষণের ফলে সরবরাহ পর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর ঘাটতি হলে যে কোনো পণ্যের মূল্য বাড়ে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ভুলের কারণে এবছরও অনেক চামড়া নষ্ট হয়েছে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপির সক্ষমতা এরই মধ্যে দ্বিগুণ করা হয়েছে। বাকি ছয় মাসের মধ্যে এটি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সক্ষমতায় চলে আসবে। এলডব্লিউজি সনদ নিয়ে একটা ভুল ধারণা আছে, ট্যানারি মালিকরা তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে এর সুফল পাওয়া যাবে না।





