ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্তফা দেবেন না বলে জানিয়েছেন। এতে সাংবিধানিক রীতি ও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার দুপুরেই ভোটের ফল মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায়। এরপর কৌতূহল তৈরি হয়, কবে তিনি রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দেবেন। কারণ, নির্বাচনে পরাজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ করা একটি প্রচলিত রীতি। সোমবার রাতে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল থেকে বের হওয়ার পর অনেকে মনে করেছিলেন, তিনি রাজভবনে গিয়ে ইস্তফাপত্র জমা দেবেন। কিন্তু তাঁর গাড়িবহর কালীঘাটের বাসভবনের দিকে চলে যায়।
মঙ্গলবার বিকেলে মমতা স্পষ্ট করে বলেন, তিনি ইস্তফা দেবেন না। তাঁর ভাষায়, ‘কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্নই ওঠে না।’
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, মুখ্যমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা না দিলে কী হবে। সংবিধানে এমন পরিস্থিতির সরাসরি উল্লেখ নেই। কারণ, নির্বাচনে পরাজয়ের পরও কেউ ইস্তফা দেবেন না—এমন নজির আগে তৈরি হয়নি। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু প্রচলিত ধারা ও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ৭ মে। সে পর্যন্ত মমতা আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। তবে ওই দিন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মেয়াদও শেষ হবে। ইস্তফা না দিলেও তখন তিনি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগে পরাজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। যেমন ২০১১ সালের ১৩ মে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ফল স্পষ্ট হওয়ার পর রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দেন।
এদিকে নির্বাচনে জয়ী ভারতীয় জনতা পার্টি নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে শপথের দিনক্ষণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। সোমবার নরেন্দ্র মোদী–এর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তী–র দিন শপথগ্রহণ হতে পারে।
বুধবার রাতে কলকাতায় আসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ–এর। তিনি বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠকে নেতৃত্ব নির্বাচন চূড়ান্ত করতে পারেন। যিনি নেতা নির্বাচিত হবেন, তিনিই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন এবং রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাবেন।
শপথগ্রহণ ৮ মে হলে ক্ষমতার হস্তান্তরে কোনো ফাঁক থাকবে না। তবে তা যদি ৯ মে বা পরে হয়, তাহলে মধ্যবর্তী সময়ের জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ‘তদারকি’ (কেয়ারটেকার) হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলা হতে পারে, অথবা প্রয়োজন হলে রাজ্যপাল নিজেও সীমিত সময়ের জন্য তদারকি করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি শাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে, যদিও এত স্বল্প সময়ের জন্য সাধারণত তা প্রয়োগ করা হয় না।
সব মিলিয়ে, মমতা ইস্তফা না দিলেও বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম। কারণ, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে। তবে প্রচলিত রাজনৈতিক রীতি না মানার প্রভাব তাঁর ভাবমূর্তিতে পড়ে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।




