জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একইসাথে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না মর্মে একমত হয়েছে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রাজনৈতিক দল ও জোট। বেশিরভাগ রাজনৈতিক এ বিষয়ে একমত হয়েছে, কিছু দল ও জোট এ বিষয়ে ভিন্নমত ব্যক্ত করেছে। এই দল ও জোটগুলো জাতীয় সনদে নোট অব ডিসেন্ট দিতে পারবে।
মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৭তম দিনের আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফকালে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনাকালে উপস্থিত ছিলেন, কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
আলী রীয়াজ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সকল রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আজকের আলোচনায় এ বিষয়ে আরো কিছু অগ্রগতি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে ২০ জুলাই তারিখে রাজনৈতিক দলসমূহের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কমিশন একটি সংশোধিত ও সমন্বিত প্রস্তাব সকল দলের নিকট প্রেরণ করে। উক্ত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দলসমূহকে মতামত প্রদান করতে বলা হয়। আজ ২২ জুলাই বিএনপি কমিশনের অধিকাংশ প্রস্তাবের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে তাদের মতামত উপস্থাপন করে। আজ প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়, তবে র্যাঙ্কড চয়েজ পদ্ধতির ব্যবহার বিষয়ে এখনো একমত হওয়া যায়নি। আগামী বৃহস্পতিবার পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সকালে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৭তম দিনের বৈঠকের শুরুতে সূচনা বক্তব্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের একটি ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করে সরকারের কাছে এর সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে, আজকের আলোচনার শুরুতে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় শোক প্রস্তাব পাঠ করেন কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার। শোক প্রস্তাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ আলোচনায় অংশ নেওয়া ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিগণ এবং কমিশনের সদস্যগণ স্বাক্ষর করেন৷
নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, গত বছর এই সময় আমরা একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। এক বছর পরে আজ এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে পুরো জাতি। কোনো ক্ষতিপূরণই এ হৃদয় বিদারক ঘটনার জন্য যথেষ্ট নয়, তবুও আমরা সরকারের কাছে সুস্পষ্ট ভাবে আহ্বান জানিয়েছি, নিহতের পরিবারদের যেন যেকোনো মূল্যে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। সেইসঙ্গে আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং এই দুর্ঘটনার যথাযথ তদন্ত করার আহ্বান আমরা জানিয়েছি। ভবিষ্যতে এ রকম পরিস্থিতি যেন আর কখনো না হয়, সেটা যেন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়। এ রকম একটি সংকটময় মুহূর্তে আমরা যেন নিজেদের জায়গা থেকে চেষ্টা করি, যারা আহত হয়েছেন ও যে সমস্ত পরিবার সন্তান ও পরিজন হারিয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে। রাষ্ট্রীয় দুর্যোগের সময় সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে, এ ভয়াবহ দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গতকাল জরুরি ভিত্তিতে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করে বৈঠক স্থগিত করে কমিশন। উল্লেখ্য, আজকের আলোচ্য সূচিতে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত প্রস্তাব-সর্বশেষ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সম্পর্কিত বিষয়সমূহ। এসময় দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে পারবেন না বলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কমিশনের প্রস্তাব জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না বলে অধিকাংশ দল একমত হয়েছে কিন্তু কিছু দল এ বিষয়ে ভিন্নমত ব্যক্ত করেছেন। সে সমস্ত দল ও জোট জাতীয় সনদে নোট অব ডিসেন্ট দিতে পারবে। ঐকমত্যে পৌঁছাতে সকলের সহায়তা কামনা করে তিনি সময়ের স্বল্পতা বিবেচনায় জরুরি ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে একটি জাতীয় সনদ উপস্থিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে আজকের আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। কমিশন জানায়, অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে ঐকমত্য গড়তে আগামীকাল সকালে পুনরায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।




