গত বছর জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রকাশ্য নির্দেশ’ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—এমনটি দাবি করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। সংস্থাটির অনুসন্ধানী ইউনিট (আই-ইউনিট) একাধিক গোপন ফোনালাপের অডিও কল রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে, যা থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন—বিক্ষোভকারীদের যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই গুলি চালাতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) প্রকাশিত আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, শেখ হাসিনার এসব ফোনালাপ গত বছরের আন্দোলনের সময় জাতীয় টেলিযোগাযোগ নজরদারি কেন্দ্র (এনটিএমসি) কর্তৃক রেকর্ড করা হয়। একটি কল রেকর্ডে তাকে স্পষ্টভাবে বলতে শোনা যায়, “ইতোমধ্যে আমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে আদেশ দিয়েছি। এখন তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে, যেখানেই পাবে গুলি চালাবে… আমি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছিলাম।” এই ফোনালাপটি ছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও শেখ হাসিনার আত্মীয় শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে, যেখানে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে হেলিকপ্টার ব্যবহারের কথাও বলেন তিনি।
আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, এসব কল রেকর্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বানানো কি না, তা পরীক্ষা করতে আই-ইউনিট সেগুলো ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিশ্লেষণ করায়। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, অডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি নয় এবং ভয়েস-ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করা গেছে।
গত বছরের আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য পুরনো কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় দিলে শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নামে। তারা অভিযোগ করে, এই ব্যবস্থা পক্ষপাতমূলক এবং এতে যোগ্যতার চেয়ে পারিবারিক পরিচয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৬ জুলাই রংপুরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলে আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়।
আল জাজিরা জানায়, শেখ হাসিনা সরকার আন্দোলন দমন করতে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়, যাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তথ্যমতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। পরবর্তী সময় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারত পালিয়ে যান বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।
আল জাজিরার হাতে থাকা আরেকটি কল রেকর্ডে দেখা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান রংপুরে নিহত আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে গুলির তথ্য বাদ দিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে চাপ দেন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রাজিবুল ইসলাম আল জাজিরাকে বলেন, তাকে পাঁচবার রিপোর্ট পাল্টাতে বাধ্য করা হয় যাতে একাধিক গুলির ক্ষত থাকার তথ্য না থাকে। তিনি জানান, পুলিশ এমন একটি রিপোর্ট চেয়েছিল যাতে লেখা থাকবে, ‘পাথর নিক্ষেপে আহত হয়ে মারা গেছেন’, অথচ সাঈদ পুলিশের গুলিতেই মারা যান।
আন্দোলনের সময় আহত শিক্ষার্থীদের শরীরে পাওয়া গুলির ক্ষত নিয়ে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শাবির শরীফ বলেন, অনেকের শরীরে এমনভাবে গুলি ঢুকেছে যে সেগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, হেলিকপ্টার থেকে হাসপাতালের প্রবেশপথ লক্ষ্য করে গুলিও চালানো হয়।
আন্দোলনের সময় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে এনে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, তারা গণভবনে যেতে বাধ্য হন, না গেলে ‘অন্যভাবে নির্যাতন’ করা হতো। গণভবনে শেখ হাসিনা নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে বিচার দেওয়ার আশ্বাস দিলেও, সাঈদের বোন সুমি খাতুন জবাবে বলেন, “ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ গুলি করেছে। এখানে তদন্তের কী আছে? আমাদের এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই গোপন কল রেকর্ডগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের কথা বলেছে। শেখ হাসিনা, তার কয়েকজন মন্ত্রী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। চলতি বছরের ১০ জুলাই শেখ হাসিনা ও তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। আগস্টে তাদের বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এনটিএমসি কেবল বিরোধী দল নয়, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের বিরুদ্ধেও নজরদারি চালিয়েছে। এমনকি শেখ হাসিনা নিজেই জানতেন যে তার ফোনালাপ রেকর্ড করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “তিনি (হাসিনা) জানতেন কথোপকথন রেকর্ড হচ্ছে, তবু বলতেন, ‘হ্যাঁ, আমি জানি, রেকর্ড হচ্ছে। সমস্যা নেই।’ তিনি অন্যদের জন্য যে গর্ত খুঁড়েছিলেন, এখন নিজেই সেই গর্তে পড়ে গেছেন।”
তবে আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র দাবি করেন, শেখ হাসিনা কখনোই গুলি চালানোর বা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেননি। বিবৃতিতে বলা হয়, ফোনালাপগুলো হয় খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে অথবা বিকৃত করা হয়েছে। পাশাপাশি আবু সাঈদের মৃত্যুর তদন্তে সরকার ‘গভীর আন্তরিকতা’ দেখিয়েছে বলেও দাবি করা হয়।



