জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নোট অব ডিসেন্ট দেয়া সত্ত্বেও একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। একথা জানিয়েছেন কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে ১০০ আসনে উন্নীত করা হবে, এ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত। তবে, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে এবং কোনো কোনো দল সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের পক্ষে। অবিলম্বে আশু পদক্ষেপ হিসেবে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব যাতে বৃদ্ধি করা যায় সেজন্য কতগুলো বিষয়ে কিছু রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছি।
বুধবার (৩০ জুলাই) দুপুরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ২২তম দিনের আলোচনার শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াত ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের সঞ্চালনায় আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো. আইয়ুব মিয়া। আলোচনাটি সরাসরি সম্প্রচার করছে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করতে যে আশু পদক্ষেপ রাখা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আছে বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল রেখে সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদের প্রয়োজনীয় সংশোধন, জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে তিনশত আসনের জন্য ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার আহ্বান জানানো এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে৷ এই পদ্ধতিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটা সাধারণ নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ বর্ধিত হারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন অব্যাহত রাখা। সংবিধানে সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়, হিসাব অনুযায়ী তা ২০৪৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে৷ তবে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থিতার লক্ষ্য ২০৪৩ সালের পূর্বেই যদি অর্জিত হয় তাহলে সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত বিধান নির্ধারিত সময়ের আগেই বাতিল হয়ে যাবে। এছাড়াও, ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব বৃদ্ধি করতে সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদ সংশোধনপূর্বক কিছু প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোকে আজ দেয়া হয়েছে৷ এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছালে সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নের বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
২২তম দিনের আলোচনার শুরুতে সূচনা বক্তব্যে তিনি জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, সুস্পষ্ট ঐকমত্যের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা আজ রাজনৈতিক দলগুলোকে দেয়া হবে। কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে সব বিষয়গুলোতে সুস্পষ্টভাবে ঐকমত্য হয়েছে সেই বিষয়গুলোর একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা আজ বিকেলের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সেইসঙ্গে, আজকের আলোচনাটি দ্রুতগতিতে অগ্রসর করতে হবে যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ঐকমত্যের বিষয়গুলো চিহ্নিত করে আগামীকালের মধ্যে একটি সনদ আমরা সবার হাতে তুলে দিতে পারি।
ড. আলী রীয়াজ বলেন, আমরা আশা করছি আজকে এবং আগামীকালই এই প্রক্রিয়ার আলোচনা শেষ করতে পারবো। আমাদের লক্ষ্য এটাই। অনেকগুলো বিষয় ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলো মতামত দিয়েছে যা নিয়ে কমিশন আজ সকালে আলোচনা করেছে। কমিশনের নিজস্ব আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং আশা করি আগামীকালের মধ্যে কমিশন আপনাদের এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারবে। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু বিষয় কমিশনের আলোচনা শেষ হয়েছে। গতকালের অধিবেশনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা শেষ হয়নি, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিষয়ক আলোচনা এখনো হয়নি কারণ এ বিষয়টি এখনো উপস্থাপিত হয়নি। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ সম্পর্কিত প্রস্তাব আপনাদেরকে আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে এবং আমরা বলেছিলাম যে এর খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আপনাদের মন্তব্য আমাদেরকে জানাতে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক আলোচনাকালে প্রত্যেকটি দলই নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণের জন্য সংবিধানের দ্বিতীয় ও প্রধানত তৃতীয় বিভাগে প্রয়োজনীয় সংযোজন বিয়োজন ও পরিমার্জনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছিলেন। সেই সময় কমিশনের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল সে পাঁচটি ব্যাপারে ঐকমত্য হয়নি, পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদনে যা ছিল তার কোন-কোন বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একমত হয়েছেন এবং কোন বিষয়গুলোতে একমত হননি তা জানিয়েছেন। লিখে রাখার কাজটি আমাদের পরবর্তীতে সাহায্য করেছে এবং সে বিষয়গুলোকে তৃতীয় ভাগে কিভাবে সন্নিবেশিত করা যায় সেটি নিয়ে আমরা বিবেচনা করেছি। অনুচ্ছেদ ধরে আলোচনা করার সময় এবং সুযোগ কোনটাই আমাদের কাছে নেই। কিন্তু আপনাদের কাছে সংশোধনী ও সংযোজনীগুলো দেওয়া হয়েছে। এগুলো পড়ার পর যদি কোন আপত্তি বা পরিবর্তন করার প্রয়োজন মনে করে থাকেন তাহলে সেই মতামতটি আগাম কমিশনকে আগামীকাল সকালের মধ্যে জানানোর জন্য অনুরোধ করেন তিনি।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে আজকের আলোচ্য সূচিতে রয়েছে- সংসদের নারী প্রতিনিধিত্ব, সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সম্পর্কিত বিষয়গুলো, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্থাৎ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩), রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, ইলেক্টোরাল কলেজ, উচ্চকক্ষের গঠন সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি, নাগরিক অধিকার সম্প্রসারণ সম্পর্কিত প্রস্তাব এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। যেহেতু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ক্ষমতার বিষয়টি আজ প্রথমবারই কমিশনের আলোচনায় তোলা হয়েছে, তাই এই বিষয়টি বাদে অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান অধ্যাপক আলী রীয়াজ।




