ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্রের তীরে, সবুজ প্রকৃতির আবেশে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রদূত- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। সময়ের ক্যালেন্ডারে আজ এর বয়স ৬৫। ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট প্রায় ১,২০০ একর জমির বুক চিরে শুরু হয়েছিল মাত্র ছয় অনুষদ নিয়ে এর পথচলা। আজ তা পরিণত হয়েছে ৪৬টি বিভাগের সমৃদ্ধ শিক্ষাঙ্গনে, যেখানে প্রতিদিন জেগে ওঠে নতুন জ্ঞানের আলো আর গবেষণার উদ্ভাবন।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছে ৫৭ হাজার ৮০৯ জন স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিধারী। বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী এখানে পাঠ নিচ্ছে, যাদের পথপ্রদর্শক ৫১৪ জন শিক্ষক। তাঁদের জন্য রয়েছে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার—২ লক্ষাধিক বই, ২২ হাজারের বেশি থিসিস, হাজারো সাময়িকী ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার, যেন গবেষণার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে থাকে এই সংগ্রহে।
বাকৃবি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য আছে ১৪টি আবাসিক হল, নির্মাণাধীন আরও দুটি। আছে দেশসেরা গবেষণাগার, জাদুঘর, বোটানিক্যাল গার্ডেন, জার্মপ্লাজম সেন্টার—সব মিলিয়ে এটি যেন কৃষি ও জীববিজ্ঞানের এক জীবন্ত বিশ্বকোষ।
৬৫ বছরের যাত্রায় বাকৃবি শুধু সংখ্যা নয়, রচনা করেছে সাফল্যের মহাকাব্য। বাউধান-৬৩, শর্ষে-৪, কমলা সুন্দরী আলু কিংবা খাঁচায় মাছ চাষ—এসব উদ্ভাবন কৃষকের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে সমৃদ্ধি। প্রাণিসম্পদে ডিজিটাল খামারি অ্যাপ থেকে শুরু করে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাক্সিন, মাছের জিনোম সিকোয়েন্স থেকে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই প্রযুক্তি—সবই এই ক্যাম্পাসের গবেষণার ফসল।
এই সাফল্যের স্বীকৃতি এসেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকেও। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০২৫ সালের এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাকৃবিকে রেখেছে ৪০১–৫০০ অবস্থানে। ওয়েবমেট্রিক্সের র্যাংকিংয়েও এটি দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম, আর বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় ২৩২৩তম।
২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট ভোরে যখন জাতীয় পতাকা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা একসাথে উড়ল ক্যাম্পাসের আকাশে, তখন কেবল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, উদযাপিত হলো এক ইতিহাস। বৃক্ষরোপণ, মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, আলোচনা সভা আর প্রার্থনায় মুখর হলো দিন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্মেলন কক্ষে মিলল অতীত আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের রূপরেখা।
শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো সেই স্বপ্ন। তানজিলা হকের চোখে বাকৃবি তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি, যেখানে প্রতিটি গাছ আর লেক তার স্বপ্নকে বড় করে তোলে। ভেটেরিনারি অনুষদের মেহেদী হাসান মনে করেন, তিনি শুধু ডাক্তার হচ্ছেন না, কৃষকের ভরসা হয়ে উঠছেন। নুসরাত জাহান দেখছেন মাছের ভেতর লুকিয়ে থাকা নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনা। আর শিহাব উদ্দিন বলছেন, এই ক্যাম্পাস তাকে শিখিয়েছে দায়িত্ব নিতে, কৃষকের ভবিষ্যৎ গড়তে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বললেন, “বাকৃবি থেকে দেওয়া ডিগ্রি শুধু সার্টিফিকেট নয়, এটি দেশের খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।”
আজ ৬৫ বছরের এই যাত্রায় স্পষ্ট—বাকৃবি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি প্রকৃতির কন্যা। যে মাটির বুকে জন্ম নিয়ে কৃষকের ঘামকে রূপ দিয়েছে সোনালি ধানে, প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে, প্রযুক্তির দিগন্তে।
জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির সংকোচন আর খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ যখন ঘনিয়ে আসছে, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠেছে আশ্রয়ের নাম। আগামী দিনের সবুজ হাতছানিতে বাকৃবি আবারও রচনা করবে নতুন ইতিহাস—কৃষক ও কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখার ইতিহাস, বাংলার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার ইতিহাস।





