দেশ নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, সরকার দিকনির্দেশনা দেবে, কিন্তু পরিবর্তনের পথে এগিয়ে আসতে হবে সবার। বর্তমান সরকার টেকসই উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করছে। শনিবার (২৩ আগস্ট) ঢাকার মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (এফজিডি) শীর্ষক ‘ডি-সেন্ট্রালাইজেশন অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ওয়েলফেয়ার অফ দ্য ক্যাপিটাল: টুয়ার্ডস আ সাসটেইনেবল ঢাকা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ভবন ও কক্ষের নকশা পরিবেশবান্ধবভাবে করতে হবে। গ্রামীণ আবহই টেকসই এবং একজন আদর্শ কৃষকের জীবন যাপনই টেকসই উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি। অনাবৃত জায়গায় ঘাস লাগাতে হবে। শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, জনগণের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। সবাইকে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে এবং পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে আসতে হবে। শিল্প দূষণের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হবে এবং ঢাকার আশেপাশের নদী দূষণ রোধে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে। পলিথিন বিরোধী প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ঢাকাকে বায়ুদূষণের কারণে সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা হয়েছে।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা বলেন, দেশের জলবায়ু পরিবর্তন ঢাকার বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে আরো প্রকট করছে। সারাদেশের টেকসই উন্নয়ন করতে হলে, তা সমাজ থেকে আসতে হবে, যেটা আমাদের মধ্যে বেশ অভাব রয়েছে। ঢাকায় জনসংখ্যা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ রাখা বেশ কষ্টসাধ্য। বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে ঢাকার আশেপাশের শহরগুলোকে স্যাটেলাইট শহর হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। পলিথিন ব্যবহার কমাতে গত এক বছরে অনেক ঝুঁকি মোকাবেলা করে বেশকিছু কাজ করেছি। এখন সরকারি অনেক সংস্থাও এগিয়ে আসছে এবং আশা করছি ভবিষ্যতে ভালো ফল পাওয়া যাবে। পরিবেশ দূষণমুক্ত চাইলে দূষণকারী শিল্পকারখানা বন্ধ করতে শিল্প-উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সভায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী দখল ও দূষণ, পরিবেশ দূষণ, পলিথিনের উচ্চ ব্যবহার এবং অসহনীয় যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় বসবাস ক্রমাগতভাবে অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিতকল্পে সারাদেশের টেকসই উন্নয়ন জরুরি।
সভার স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের জিডিপিতে ঢাকা শহরের অবদান ৪৫ শতাংশ। যদিও ২০২২ সালে বুয়েট পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার প্রতিদিন যানজটের জন্য ১৪০ কোটি টাকার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ঢাকার উপর চাপ হ্রাস ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য প্রশাসনিক এবং বাণিজ্যিক কাজে ঢাকার আশেপাশের শহরগুলোকে সেকেন্ডারি শহর হিসেবে তৈরি করতে হবে। ঢাকাকে বাসযোগ্য ও টেকসই মহানগর হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, টেকসই ঢাকা তৈরি করতে হলে পুরো বাংলাদেশকেই টেকসই করতে হবে, যা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস হিসেবে রাজধানী শহরের কোন বিকল্প উৎস নেই, এর উপর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং ভবিষ্যতেও এটা কমার সম্ভাবনা প্রতিফলিত হচ্ছে না। ঢাকার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার কোন বিকল্প নেই।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেডর ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ রাজধানীতে বসবাস করলেও ঢাকার সবুজায়নের অভাব এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এখানকার জীবনযাপন বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। অতিকেন্দ্রিকতার কারণে ঢাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি, বর্জ্য অব্যবস্থাপনার সংকট, নগর দূষণ এবং জনস্বাস্থ্য সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশেষ করে দেশের নদীগুলোর সুরক্ষার জন্য তিনি নদী কমিশনের সক্ষমতা ও আইনি ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণে সুষম নগরায়ণ ও শহরের বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের উপর জোরারোপ করেন। এছাড়াও ঢাকার প্রস্তাবিত রিং-রোডগুলোকে যোগাযোগের করিডোর বিবেচনা করে প্রাধিকার ভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ভূগোলবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদ দিলবাহার আহমেদ, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, ডিসিসিআইর সাবেক সহ-সভাপতি এম. আবু হোরায়রা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক, রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম, স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জিয়াউল হক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম প্রমুখ ।




