দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর সেনা-পুলিশের লাঠিপেটার ঘটনা সম্পর্কে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন বলছিলেন, এই হামলা শুধুমাত্র ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে নয়। যদি ছত্রভঙ্গ করতেও চাইতেন, তাহলে আপনি (সেনা-পুলিশ) তো হাতে আঘাত করতে পারতেন, পায়ে করতে পারতেন। আপনি কেন মাথায় মারতেছেন, কেন চোখে মারতেছেন, আপনি কেন বুকে মারতেছেন। সেনা সদস্যদের নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমাদের নেতাকর্মীদেরকে মাটিতে ফেলে, এমনকি যারা অফিসের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদেরকে সেখানে গিয়ে নির্বিচারে পেটানো হয়েছে। বেধড়ক পিটুনিতে নুরুল হক নুরুর নাক ভেঙে গেছে, চোখে আঘাত লেগেছে।এসব দেখে আমাদের কাছে এখন যেটি মনে হয়, এটি একটা মাস্টারপ্ল্যান ছিল এবং সেই মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবেই নুরুল হক নুরকে চিনতে পারার পরেও এভাবে হামলা চালিয়েছে
গত ২৯ অগাস্ট রাতে ঢাকার কাকরাইল এলাকায় জাতীয় পার্টির সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের একপর্যায়ে লাঠিপেটার ওই ঘটনাটি ঘটে। দলটি দাবি করেছে, সেই ঘটনায় তাদের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। তাদের মধ্যে দলের সভাপতি নুরুল হক নুরকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। ৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী ভেঙে পড়ায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তখন সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে রাখে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। গত এক বছর ধরে মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছুক্ষেত্রে তারা যে ভূমিকা রেখেছে, সেটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও হতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছেন, আবার কোথাও কোথাও অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকছেন। একই ধরনের ঘটনায় দুই রকম প্রতিক্রিয়া দেখানোয় বাহিনীর ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।
- কোথাও কঠোর, কোথাও নরম
গণঅধিকার পরিষদের ঘটনাটির আগে সংঘর্ষের আরেকটি ঘটনায় মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে সমালোচনার মুখে পড়তে দেখা গিয়েছিল সেনাবাহিনীর সদস্যদের। গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির সমাবেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের হামলার জেরে সংঘর্ষটির সূত্রপাত হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় চলা সংঘর্ষের একপর্যায়ে সেনা-পুলিশের সদস্যরা গুলি চালালে বেশ কয়েক জন প্রাণ হারান। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সেনা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের এসব ঘটনার বিপরীতে কিছুক্ষেত্রে আবার উল্টো চিত্রও লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খুলনায় একটি গণপিটুনির ঘটনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়।
ইসলামের নবীকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর একদল ব্যক্তি মব তৈরি করে পুলিশের কার্যালয়ের ভেতরেই হিন্দু ধর্মের এক তরুণকে গণপিটুনি দেয়। উৎসব মন্ডল নামের ওই তরুণকে তারা যখন গণহারে পেটাচ্ছিলো, সেনাবাহিনীর সদস্যরা তখন পাশেই অবস্থান করছিলেন। কিন্তু গণপিটুনি ঠেকাতে তাদেরকে সেভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। মারধরের একপর্যায়ে মৃত ভেবে ফেলে যাওয়ার পর সেনা সদস্যরা মন্ডলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন। গণপিটুনিতে ছেলেটি মারা গেছে বলে প্রথমদিকে খবর প্রচারিত হলেও পরে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয় যে, মন্ডল বেঁচে রয়েছেন।
কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোথাও কঠোরতা, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নমনীয় ভাব দেখানোর এমন সব ঘটনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মীরা। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, মব যে ব্যাপারটা, পুলিশের ক্ষেত্রেও আমরা দেখছি, সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রেও দেখছি যে, যথাযথ ভূমিকা তারা গ্রহণ করতে পারছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা দেখছি তারা এক্সট্রিম পর্যায়ে অবস্থান নিচ্ছে, আবার কোনো কোনো পর্যায়ে দেখছি তারা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকছে অথবা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর এই ধরনের অবস্থান মানুষের ভেতর নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
- ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার কারণ কী?
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভিন্ন সময় সরকারগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আগেও মাঠে রেখেছে। কিন্তু সেগুলোর কম ক্ষেত্রেই বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এখনকার মত এত আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যায়নি বলে মনে করেন সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের অনেকে। তাহলে এখন কেন সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ছে? নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেছে, এটা আমার মনে হয় ইউনিফায়েড যে কমান্ড থাকে যে, কী হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেখানে এক ধরনের অভাববোধ রয়েছে। মূলত সেই কারণেই মাঠে থাকা সেনা সদস্যরা ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন। কিন্তু সেম সিচ্যুয়েশনে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। তার কাছে ক্লিয়ার কমান্ড থাকবে, ইন্সট্রাকশন থাকবে যে, যদি এরকম হয়, তাহলে তুমি এই ব্যবস্থা নিবা। সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাদেরকে সুষ্পষ্ট কর্মপরিধি ও পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আগামীতে বাহিনীর ভূমিকা আরও বিতর্কের মুখে পড়তে পারে। সেনাবাহিনী ও দেশের জন্য সেটি মোটেও মঙ্গলজনক হবে না। সেজন্য হয় ক্লিয়ার ইন্সট্রাকশন দিতে হবে, তা না হলে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
- দায় কার?
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে যখন সেনাবাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পর তাদেরকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, একবছর পরে এসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো মব সহ নানান বিশৃঙ্খলা সংঘটিত হতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, পুলিশ বাহিনীও পুরোপুরিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনীকে ক্যান্টমেন্টে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।
কিন্তু মাঠে রাখা হলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের যে “পরিষ্কার নির্দেশনার” ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, সেটির দায় কার? সেনাবাহিনীর নাকি সরকারের? বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, যারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেই জায়গায় আসলে সংকটটা রয়ে গেছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা কীভাবে রক্ষা করা হবে, মব কিংবা রাজনৈতিক দল বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সে সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছ এবং সুস্পষ্ট কোনো অবস্থান নেই। সেটা না থাকার কারণে এটার যে প্রয়োগের জায়গা, সেই প্রয়োগে বিভিন্ন রকমের ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে এবং যা থেকে কিছু কিছু বিতর্কের জায়গাও তৈরি হচ্ছে।
এদিকে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তবে গত ২৯ অগাস্টের লাঠিপেটার ঘটনার পর আইএসপিআরের পক্ষ থেকে যে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, মব সহিংসতার বিরুদ্ধে অন্তর্বতী সরকারের “জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়েই গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছেন সেনা সদস্যরা। অন্যদিকে, সেনা-পুলিশের লাঠিপেটায় গণঅধিকার পরিষদ নেতা নুরুল হক নুর আহত হওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকেও বিবৃতি দিয়ে ঘটনার নিন্দা জানাতে দেখা যাচ্ছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যের এমন ফারাকের কারণেও “নানান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ডালটালা মেলছে” এবং সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র : বিবিসি বাংলা




