নেপালে দুই দিনের টানা বিক্ষোভেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। মঙ্গলবার এক চিঠিতে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। সেখানে লিখেছেন, “দেশে চলমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সাংবিধানিক সমাধানের পথ সুগম করতে আমি প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অব্যাহতি নিচ্ছি।”
ওলির পদত্যাগ আসে এমন এক সময়, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। সোমবার পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৯ জন নিহত হওয়ার পর মঙ্গলবার রাজধানী কাঠমান্ডুতে আরও সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদকারীরা সংসদ ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়, ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। পরে আন্দোলনকারীরা শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতেও হামলা চালায়। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর, ওলির নিজ বাসভবনসহ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেরবাহাদুর দেউবা, বর্তমান প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক এবং মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দাহালের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেউবার স্ত্রী ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অর্জু দেউবা রানার মালিকানাধীন একটি বেসরকারি স্কুলেও আগুন লাগানো হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সোমবার রাতেই সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তথ্যমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুঙ জানান, “জেন-জেড প্রজন্মের দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালু করা হয়েছে।” তবে এতে ক্ষুব্ধ তরুণরা আন্দোলন থামায়নি। তাদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা কেবল ক্ষোভের শেষ বিন্দু; মূল কারণ হচ্ছে লাগামহীন দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২৭ বছর বয়সী এআই ইঞ্জিনিয়ার ইউগান্ত ঘিমিরে বলেন, “আমরা একই পুরনো মুখে ক্লান্ত। এই সরকার দুর্নীতিতে ডুবে আছে, কেউ জবাবদিহি করে না। এখনই সময়, পুরনো নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার।” রাজনৈতিক বিশ্লেষক কৃষ্ণ খানালের মতে, আন্দোলনকারীদের সামলাতে সরকারের ব্যর্থতা এবং ‘চরম অবহেলাই’ এই সহিংসতা ও প্রাণহানির জন্য দায়ী।
কাঠমান্ডুর রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে স্লোগান—“কেপি চোর, দেশ ছাড়”, “দুর্নীতিবাজদের বিচার চাই”। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে সাংবাদিক রাম্যাটা লিম্বু আল জাজিরাকে বলেন, “এখন মনে হচ্ছে দেশে কেউই দায়িত্বে নেই। সংসদ ভবনে আগুন জ্বলছে, রাস্তায় হাজারো মানুষ। চারদিকে যেন অরাজকতা।”
প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ২০ জনের বেশি নিহত এবং শতাধিক আহত হওয়ার পর দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়। কাঠমান্ডু, ললিতপুর ও ভক্তপুরে সেনা টহল জোরদার করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতেই প্রধানমন্ত্রী ওলি পদত্যাগপত্র জমা দেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, পদত্যাগের আগে তিনি সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতি সামলাতে অনুরোধ করেন। শোনা যাচ্ছে, তিনি দুবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার জন্য হিমালয়া এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ললিতপুরের ভৈসেপাটিতে হেলিকপ্টার ঘোরাঘুরির খবরও মিলেছে।
একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও সেনা হেলিকপ্টারে তাদের বাসা থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্তত পাঁচটি হেলিকপ্টারে মন্ত্রীদের বিমানবন্দরে আনা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সোমবার যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে, তা এখন রূপ নিয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার বিদ্রোহে। বিক্ষোভকারীরা বলছে, এ লড়াই কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং একটি দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রাম।






