কলেজে জীববিজ্ঞান ক্লাসে প্রথম মাইক্রোস্কোপে কোষ দেখেছিলেন মারজানা আক্তার। কাচের স্লাইডের নিচে ক্ষুদ্র এক জগৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর চোখের সামনে। তখন হয়তো ভাবতেও পারেননি, সেই দেখা কোষের পথ ধরে একদিন পৌঁছে যাবেন জাতিসংঘের বায়োসিকিউরিটি নিয়ে বৈশ্বিক মঞ্চে।
ছোট শহরে বেড়ে ওঠা মারজানা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী। বিজ্ঞানের বই, জীববিজ্ঞানের গল্প—সবকিছুই টানত তাঁকে। জীবনের আণবিক রহস্য বোঝার আগ্রহ থেকেই ভর্তি হন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাস্ট) বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে।
সেখানেই তিনি উপলব্ধি করেন, প্রতিটি প্রোটিন, জিন ও এনজাইমের আছে নিজস্ব গল্প। আর এই গল্প বুঝতে হলে ল্যাবই সবচেয়ে বড় শিক্ষক। সেই উপলব্ধি থেকেই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতকোত্তর পড়া শুরু করেন। এখানে তিনি জীবাণু, ভাইরাস ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি গবেষণার সুযোগ পান।
কিন্তু এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। স্নাতকোত্তর পড়ার সময়ই তিনি সন্তানসম্ভবা হন। সকালে ক্লাস, বিকেলে ল্যাব, রাতে থিসিস লেখা—সব চলছিল একসঙ্গে। গর্ভাবস্থার ষষ্ঠ মাসে গুরুতর শ্বাসকষ্টে আইসিইউতে ভর্তি হতে হয় তাঁকে, কাটাতে হয় পাঁচটি ভয়াবহ দিন।
তবু থামেননি মারজানা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, ‘সুস্থ হয়ে থিসিস শেষ করব।’ সন্তান জন্মের পরও সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেছেন দৃঢ় মনোবলে। অসুস্থ শরীর নিয়েও থিসিস ডিফেন্ড করেছেন তিনি।
এই সময় তাঁর পাশে ছিলেন পরিবার, জীবনসঙ্গী ইউশা আরাফ ও গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক গোলজার হোসেন। মারজানা বলেন, ‘স্যার সব সময় বলতেন, নিজের গতিতে এগিয়ে চলো। নিজের ওপর যখন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতাম, তখনই স্যার আবার সাহস জুগিয়েছেন।’
ইউশা আরাফ তখন নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব অকল্যান্ডে পিএইচডি করছিলেন। দূরত্ব সত্ত্বেও প্রতিদিন ফোনে অনুপ্রেরণা দিতেন স্ত্রীকে। তিনিই প্রথম মারজানাকে জানান জাতিসংঘের বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস কনভেনশন ও বায়োসিকিউরিটি বিষয়টি সম্পর্কে। ওই কনভেনশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ দপ্তর বিশ্বব্যাপী ফেলোশিপ দিচ্ছিল।
গবেষণাতেও মারজানার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পোলট্রিতে প্রথমবারের মতো তিনি শনাক্ত করেন চিকেন ইনফেকশাস অ্যানিমিয়া ভাইরাসের (CIVa) ই জিনোটাইপ থ্রিবি স্ট্রেইন। এটি দেশের ভাইরোলজি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
গর্ভাবস্থায় এই কাজ চালিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন। মারজানার ভাষায়, ‘গবেষণাই আমাকে ধৈর্য আর অধ্যবসায় শিখিয়েছে। সম্ভবত এই মানসিকতাই আমাকে ফেলোশিপ নির্বাচনে আলাদা করেছে।’
তবু ভাগ্য সব সময় সহায় হয়নি। জাপানের সাকুরা সায়েন্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে তাঁর ল্যাব নির্বাচিত হয়েছিল, কিন্তু আইসিইউতে থাকার কারণে তিনি অংশ নিতে পারেননি। তবে এই না পাওয়া তাঁকে দমাতে পারেনি। বরং তাঁর উপলব্ধি—‘প্রতিটি না পাওয়াই পরবর্তী সাফল্যের প্রস্তুতি।’
অবশেষে আসে জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সকালটি। জাতিসংঘের ‘ইয়াং উইমেন ফর বায়োসিকিউরিটি ফেলোশিপ ২০২৫’-এর ইমেইল হাতে পেয়ে প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না—‘বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে মাত্র ১০ জন তরুণী গবেষক নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের একজন আমি!’
এই অর্জনকে মারজানা দেখছেন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। ডিসেম্বর মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠেয় সমাপনী সভায় তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
বর্তমানে মারজানার গবেষণার বিষয় বায়োসিকিউরিটি—যেখানে লক্ষ্য জীববিজ্ঞানের জ্ঞানকে মানবকল্যাণে ব্যবহার ও ল্যাব সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাঁর আশা, বাংলাদেশে তরুণ গবেষক, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি হবে।
‘মেয়েরা গবেষণাসহ সব ক্ষেত্রেই সফল হতে পারে,’ বলেন মারজানা। ‘শুধু দরকার বিশ্বাস, অধ্যবসায় আর সঠিক দিকনির্দেশনা।’
আজ তিনি নয়টি গবেষণাপত্রের লেখক, একজন মা এবং একজন গবেষক। মেয়ে আনাইজার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি পান। তাঁর একটাই চাওয়া—আনাইজা যেন একদিন গর্ব করে বলতে পারে,
‘আমার মা কখনো হাল ছাড়েননি।’




