আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তে ভয়াবহ সংঘর্ষে ডজনের বেশি সেনা নিহত হয়েছে। দুই দেশই একে অপরের ওপর আগ্রাসনের অভিযোগ করেছে। শনিবার গভীর রাতে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে একে অপরের সীমান্ত পোস্টে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায় দুই দেশের সেনারা।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, দুই দেশই বিপুল প্রাণহানির দাবি করলেও কোনো পক্ষের দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর এটি দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রোববার সকালে সংবাদ সম্মেলনে আফগান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, সীমান্তের কয়েকটি স্থানে তালেবান বাহিনী হামলা চালিয়ে ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে। এতে তালেবানের নয়জন সদস্য নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তাদের পাল্টা হামলায় ২০০-র বেশি তালেবান যোদ্ধা ও মিত্র জঙ্গি নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের ২৩ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, পাকিস্তান তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন ও সীমান্তে হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। কয়েক দিন আগে তালেবান অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তান আফগান সীমান্তের পাকতিকা প্রদেশে একটি বাজারে বিমান হামলা চালিয়েছে।
কাবুল জানিয়েছে, তারা রাতভর অভিযানে পাকিস্তানের অন্তত ২০টি সেনা পোস্ট দখল করেছে। অপরদিকে পাকিস্তানের দাবি, তারা সাময়িকভাবে ২১টি আফগান পোস্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন, আফগান বাহিনীর হামলা ছিল “গুরুতর উসকানি।” তিনি জানান, পাকিস্তানি বাহিনী আফগানিস্তানে তালেবান ঘাঁটি ও জঙ্গি অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, আফগান বাহিনী “অবৈধ আগ্রাসন” চালিয়েছে, আর পাকিস্তান “সংযম ও দৃঢ়তার” সঙ্গে জবাব দিয়েছে।
রোববার দুপুরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হতে শুরু করে। কাতার ও সৌদি আরব উভয় পক্ষকে সংযমের আহ্বান জানায়। ভারতের নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুতাকি বলেন, “আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করেছি। বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর অনুরোধে যুদ্ধ বন্ধ করেছি। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চাই, আলোচনার দরজা খোলা রেখেছি।”
দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী কেউই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করবে না।
১ হাজার ৬০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্তটি আফগানিস্তান “দুরান্দ লাইন” নামে উল্লেখ করে। এ সীমান্ত ঘিরে দুই দেশের মধ্যে এর আগেও বহুবার সংঘর্ষ হয়েছে।
সম্প্রতি তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তান আফগান আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে এবং পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমাদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, “আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নেব।”
গত ডিসেম্বরে আফগান সরকার অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তানের হামলায় পূর্ব আফগানিস্তানে ৪৬ জন নিহত হয়েছে, যাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। পাকিস্তান বলেছিল, তারা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর চার বছরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ভয়াবহভাবে অবনতি হয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান সীমান্তের ওপারেও একই মতাদর্শী গোষ্ঠীগুলোর সাহস বাড়িয়েছে, যা এখন দুই দেশকেই অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।




