আউল-বাউল ও ফকিরের দেশ বাংলাদেশ। এই আউল-বাউল ফকিরদের জীবনধারার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির শিকড়। এই সংস্কৃতি আমাদের গর্বিত করে সমাজের প্রতিটি স্তরে। ইতিহাস থেকে বর্তমান—বাংলা সংস্কৃতির এই ধারা নিয়ে অসংখ্য গবেষক আজও কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমরা এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সংস্কৃতি আধুনিক হচ্ছে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আধুনিকতা যেন সংস্কৃতির শিকড় ছিন্ন না করে, সেটিই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নব প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা দোষের নয়; কিন্তু আধুনিকতার নামে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করাই সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির নামে বিকৃত রুচি ও নিম্নমানের উপস্থাপন আমাদের সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাবা-মাকে নিয়ে হাস্যরস, স্ত্রীকে নিয়ে অশালীন কৌতুক কিংবা সামাজিক সম্পর্ক ও পরিবেশ নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র হয়তো সাময়িক বিনোদন দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রজন্মের মানসিকতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শারীরিক গঠন বা দুর্বলতাকে উপহাসের উপকরণ বানানোও মানবিকতা ও সংস্কৃতির পরিপন্থী।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো—এই তথাকথিত “কনটেন্ট ক্রিয়েটর” বা “অভিনেতা”দের অনেক সময় মঞ্চে বা অনুষ্ঠানে স্থান দেওয়া হয় গর্বের সঙ্গে, অথচ সত্যিকার সংস্কৃতিবান মানুষরা থেকে যান উপেক্ষিত ও অপমানিত।
প্রবাসেও এই অবক্ষয়ের জন্য কিছু মিডিয়া দায়মুক্ত নয়। অনেক বাংলা টেলিমিডিয়া কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থে অনুষ্ঠান তৈরি করে, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে নয়। অথচ গণমাধ্যমই পারে প্রবাসের প্রজন্মকে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী করে তুলতে।
একসময় মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করত। সেই সংবাদপত্রই ছিল জ্ঞানের উৎস। শিশু-কিশোর, খেলাধুলা, রাজনীতি, বিনোদন—প্রতিটি বিভাগেই ছিল আলাদা পাঠকের আগ্রহ। কিন্তু এখন অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা সংবাদ, অপসংস্কৃতি ও গুজবের প্রভাব বেড়েছে, কমেছে বিশ্বাসযোগ্যতা।
অনেকেই নিজেদের ‘সাংস্কৃতিককর্মী’ হিসেবে পরিচয় দেন, কিন্তু বিকৃত উপস্থাপনার প্রতিবাদ করতে ভয় পান—যদি ব্যক্তিস্বার্থে আঘাত লাগে! অথচ সংস্কৃতি মানে আত্মিক মূল্যবোধের চর্চা; যেখানে অসুস্থতা, অশালীনতা বা অবক্ষয়ের জায়গা নেই।
আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি কোন সংস্কৃতি চর্চা করছি? আমি কি আমার সমাজ ও ভাষার প্রতি দায়বদ্ধ? যদি সত্যিই আমরা বাঙালি সংস্কৃতি প্রেমী হই, তবে ঘৃণাভরে এই অসুস্থ চর্চা বর্জন করব।
বিদেশের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে মিডিয়াকে হতে হবে আরও দায়িত্বশীল। কেবল ব্যবসা নয়, সমাজ ও সংস্কৃতির স্বার্থে কাজ করতে হবে। প্রবাসের দায়িত্বশীল টেলিমিডিয়া যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে নব প্রজন্মও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত হতে পারবে।
সবশেষে, আমরা যারা সাধারণ বাঙালি—আমাদের এখনই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অসুস্থ কনটেন্ট, বিকৃত হাস্যরস বা তথাকথিত ‘সামাজিক অনুষ্ঠান’গুলো বয়কট করতে হবে। সমাজপতি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
একটি ভাষার সংস্কৃতি হলো সেই ভাষাভাষী মানুষের জীবনব্যবস্থা—আচরণ, বিশ্বাস, জ্ঞান, শিল্প, নীতি, আইন, প্রথা ও রীতিনীতির প্রতিফলন।
তাহলে নিজেকে একবার প্রশ্ন করুন—আপনি কোন সংস্কৃতি সমাজের সামনে উপস্থাপন করছেন?
আসুন, আমাদের সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে গ্রহণ করি। কারণ, আমার সংস্কৃতি—আমার অহংকার।





