নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার কলুংকা সৈয়দপুরী খানকায় শুরু হয় আমাদের তিন দিনের আধ্যাত্মিক সফর। ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে মোহনগঞ্জ, ২৫ জানুয়ারি কলমাকান্দার জীবনপুর এবং ২৬ জানুয়ারি সুনই এলাকায় পীর সাহেব সৈয়দপুরী সৈয়দ মুমিন আহমদ মবনু’র সান্নিধ্যে এই সফর অনুষ্ঠিত হয়।
এই সফরে পীর সাহেবের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন শিল্পী মাসুম বিল্লাহ, মাওলানা আহমেদ সাঈদ ও সৈয়দ মাসুদ। প্রতিটি মাহফিলে পীর সাহেব ফকিরীর মর্মকথা নিয়ে ভক্ত, শিষ্য ও মুরিদানদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ নসিহত পেশ করেন।
পীর সাহেব তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, “ফকির” শব্দের অর্থ ভিক্ষুক নয়। ভিক্ষুকের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘মিসকিন’। ফকির হলেন তত্ত্বজ্ঞানী, খোদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ, যিনি শুভ চিন্তা ও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। ফকির ফারসি ‘দরবেশ’ শব্দের সমার্থক। তাই অনেকেই ফকির-দরবেশ একসঙ্গে ব্যবহার করেন। ফকির আল্লাহর কাছে চায়, আর ভিক্ষুক গায়রুল্লাহের কাছে।
তিনি আরও বলেন, ফকির হওয়া কোনো হালকা বিষয় নয়। সাধনা ছাড়া কেউ ফকির হতে পারে না। এই সাধনার জন্য তিনি ফকিরীর চারটি সবক বা ধাপ ব্যাখ্যা করেন।
প্রথমত, মুর্শিদের সাধনা। এই সাধনার মূল হলো ধৈর্য। একে তরিকত বলা হয়। এর দুটি স্তর রয়েছে— তাসাউরে শায়খ বা মুর্শিদ এবং ফানা ফিস শায়খ বা মুর্শিদ।
দ্বিতীয়ত, সাহাবীদের সাধনা। এটিকে তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন। এখানেও দুটি স্তর রয়েছে— তাসাউরে সাহাবী, অর্থাৎ সাহাবীদের জীবন জানা এবং ফানা ফিস সাহাবী।
তৃতীয়ত, রাসুল (সা.)-এর সাধনা, যা ঈমানের অংশ। এর স্তর দুটি হলো— তাসাউরে রাসুল, অর্থাৎ রাসুলের জীবন ও আদর্শ জানা এবং ফানায়ে রাসুল বা আশিকে রাসুল হওয়া।
চতুর্থত, আল্লাহর সাধনা। এতে তিনটি স্তর রয়েছে— মারিফাতুল্লাহ, ফানাফিল্লাহ এবং বাকাবিল্লাহ।
পীর সাহেব আল্লাহর নিকট পৌঁছানোর চারটি সফরের কথাও তুলে ধরেন। প্রথমটি জমিনের সফর, যেখানে মানুষ দুনিয়ার বিষয়গুলো বোঝে ও শেখে। দ্বিতীয়টি আল্লাহর দিকে সফর, অর্থাৎ আল্লাহকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। তৃতীয়টি আল্লাহর ভিতরে সফর, যেখানে আল্লাহর সিফতি নাম ও তাদের কর্মগত অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে তাজাল্লি লাভ করা হয়। চতুর্থ ও শেষ সফর হলো আল্লাহ থেকে বান্দার দিকে ফিরে আসা, অর্থাৎ সৃষ্টির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি ছিল আলমে আমরে মানুষের রূহ, ফেরেশতা এবং নুরে মুহাম্মদ (সা.)। আল্লাহ তাআলা যখন ‘কুন’ বলেছিলেন, তখনই ‘ফায়াকুন’-এর মাধ্যমে এই সৃষ্টিগুলো অস্তিত্ব লাভ করে। পরবর্তীতে মানুষের রূহ আলমে আমর থেকে আলমে খালকে আসে মাটির দেহের মাধ্যমে এবং মৃত্যুর পর আবার দেহ ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। তবে প্রত্যেক রূহের গন্তব্য এক নয়। আমলের ভিত্তিতে কেউ জান্নাতে, কেউ জাহান্নামে যাবে। এ কারণেই দুনিয়াকে আখিরাতের ক্ষেত বলা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ভালো চাষ করলে আখিরাতে শান্তি, নতুবা কষ্ট অনিবার্য।
মাহফিলের শেষাংশে পীর সাহেব সকলকে নিয়ে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। মাহফিলগুলোতে শিল্পী মাসুম বিল্লাহের নেতৃত্বে এবং সৈয়দ মাসুদের সহযোগিতায় হামদ ও নাত পরিবেশিত হয়, যা পুরো পরিবেশকে আরও ভাবগম্ভীর ও আধ্যাত্মিক করে তোলে।
এই সফর অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল আত্মশুদ্ধি, উপলব্ধি এবং অন্তর জাগরণের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।




