গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর আজ বৃহস্পতিবার দেশের মানুষ একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোট দিচ্ছেন। একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের একাধিক মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট দিয়ে মত জানাচ্ছেন ভোটাররা।
আজ সকাল সাড়ে সাতটা থেকে একযোগে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ। ভোট চলবে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসীর উদ্দিন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এবারের নির্বাচন গতানুগতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নয়। একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এটি হতে পারে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ। অন্যদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন ‘একতরফা’, ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন ‘আমি-ডামির নির্বাচন’ নামে পরিচিতি পায়। ওই তিন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি ভোটারদের একটি বড় অংশ। সর্বশেষ তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এসব কারণে এবার ভোট ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ভোট গ্রহণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করছেন সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সাড়ে ৯ লাখের বেশি সদস্য। ভোট দিতে গ্রামের উদ্দেশে গত দুই দিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে।
একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। বাকি ২৯৯টি আসনে ভোট হচ্ছে। ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ মোট ৫০টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
১৯৯১ সাল থেকে সব অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার মূল প্রতিযোগিতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের মধ্যে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ৫ কোটির বেশি। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফল নির্ধারণে তরুণ ও নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
নির্বাচন ও সংস্কারের প্রেক্ষাপট
২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। পরে ২০১১ সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এর পর থেকে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রবণতা বাড়তে থাকে এবং নির্বাচনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা ভারতে আশ্রয় নেন। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। সরকার শুরু থেকেই সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিনটি অর্পিত দায়িত্বের কথা বলে আসছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় আজ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের কিছু ঘটনার বিচার হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করে। পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়। এসব প্রস্তাব নিয়ে প্রস্তুত করা হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংশ্লিষ্ট, যা আজ গণভোটে তোলা হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। প্রস্তাবিত সংস্কারের লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ।
‘হ্যাঁ’ জিতলে কী পরিবর্তন
গণভোটে সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ভূমিকা থাকবে। সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার স্বাধীনতার পরিসরও বাড়বে। তবে কিছু প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করবে।
আওয়ামী লীগ না থাকা নিয়ে প্রশ্ন
নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের কয়েকটি শরিকসহ মোট নয়টি নিবন্ধিত দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোট বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে গণতান্ত্রিক ঘাটতি ছিল। এখন যারা ত্রিশের কোঠায়, তাদের অনেকেই কখনো ভোট দিতে পারেননি। গণতান্ত্রিক অধিকার হরণে জড়িতরা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ায় কিছু দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এতে ভোটার উপস্থিতি কমবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে আজ একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটিই এই কমিশনের প্রথম বড় পরীক্ষা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আজকের নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ।




