রমজান মুসলমানদের জীবনে এক মহিমান্বিত মাস। এই মাস আত্মসংযম, তাকওয়া, সহমর্মিতা, দানশীলতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়—এটি মানুষের ভেতরের লোভ, অহংকার, অন্যায় ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর একটি প্রশিক্ষণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে রমজানের প্রকৃত চেতনা আড়ালে পড়ে যায় কিছু সামাজিক প্রথা ও প্রদর্শনীর কারণে। এর মধ্যে একটি হলো নতুন বিবাহিত কন্যার বাড়িতে বড় আকারে ইফতারি পাঠানোর প্রচলন।
সমাজে ইফতারি দেওয়া একটি সুন্দর কাজ—যদি তা আন্তরিকতা ও সামর্থ্যের মধ্যে হয়। হাদিসে আছে, কাউকে ইফতার করালে সওয়াব রয়েছে। কিন্তু যখন এটি সামাজিক চাপ, প্রতিযোগিতা বা বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়, তখন সেই আমল তার সৌন্দর্য হারায়। বিশেষ করে নতুন বিবাহিত মেয়ের বাবার ওপর বড় আকারে ইফতারি পাঠানোর যে অলিখিত চাপ তৈরি করা হয়, তা অনেক সময় এক ধরনের সামাজিক নিপীড়নে রূপ নেয়।
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অনেক পিতা কন্যার সম্মান রক্ষার জন্য ধার-দেনা করে, সঞ্চয় ভেঙে, এমনকি কষ্টে জীবনযাপন করে এই বাধ্যতামূলক ইফতারির আয়োজন করেন। অনেক সময় তারা না খেয়ে থেকেও সামাজিক চোখরাঙানির ভয়ে কনের বাড়ি ইফতার প্রেরণ করেন। এটি নিঃসন্দেহে রমজানের শিক্ষা নয়। বরং এটি যৌতুক সংস্কৃতিরই আরেকটি রূপ।
ইসলামে বিয়েকে সহজ করতে বলা হয়েছে, কঠিন নয়। কোথাও বলা হয়নি যে কন্যার পরিবারকে বিয়ের পর বারবার উপঢৌকন দিতে হবে। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যার প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীল আচরণই মুখ্য। যদি কোনো আমল মানুষের কষ্ট বাড়ায়, ঋণের বোঝা চাপায়, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে—তবে তা অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
আমাদের উচিত রমজানের ইফতার সংস্কৃতিকে সরল ও মানবিক করা। যদি ইফতারি দেওয়া হয়, তা হোক সামর্থ্য অনুযায়ী, আন্তরিকভাবে—প্রদর্শনের জন্য নয়। কন্যার শ্বশুরবাড়িরও দায়িত্ব আছে এই বিষয়টি সংবেদনশীলভাবে দেখা। তারা চাইলে স্পষ্টভাবে জানাতে পারেন—কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই, দোয়া থাকলেই যথেষ্ট।
সমাজের সচেতন মানুষ, আলেম ও সামাজিক নেতাদের এ বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন।মসজিদের খুতবায়, সৌশাল মিডিয়ায় এর নেতিবাচক আলোচনা পর্যালোচনা, সংবাদপত্রে লেখালেখির মাধ্যমে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কারণ, রমজান কষ্ট বাড়ানোর জন্য নয়—কষ্ট লাঘব করার শিক্ষা দেয়।
রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সরলতায়, সংযমে, এবং অন্যের বোঝা হালকা করার মানসিকতায়।
‘তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার
করো এবং তাদের প্রতি সদয় হও!’
বিদায় হজ্জের ভাষণে মুহাম্মাদ (সা.) এই নারী সম্পর্কে দেড় হাজার বছর আগে বলে গেছেন, হে মানুষ, নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নিরাপত্তার অধীনে গ্রহণ করেছো এবং আল্লাহর বাণী অনুসারে তাদেরকে তোমাদের জন্য হালাল করেছো। তোমরা কি শুনেছো যে, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের স্ত্রীদেরও তোমাদের ওপর অধিকার আছে? তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো এবং তাদের প্রতি সদয় হও! কারণ তারা তোমাদের অংশীদার এবং নিবেদিতপ্রাণ সাহায্যকারী। তারা তোমাদের অংশীদার, সম্পত্তি নয়, দাস নয়।
মুহাম্মদ (সাঃ) কখনও তাঁর কোন স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক আঘাত করেননি। ওই ভাষণেই মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি সর্বোত্ত।
মহানবীর এই কথা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নারীর মর্যাদা কোনো ক্ষেত্রেই পুরুষের চেয়ে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। অথচ, আমাদের সমাজ এখনো যেনো সেই সত্য মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। আর এ কারণেই ঘরে ঘরে নারীর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত। বিশেষ করে পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকা পবিবারে স্ত্রী হিশেবে নারী যে কতো অবহেলার শিকার, প্রতিটি রমজানে যেটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যায়। আসুন, এই রমজানে কনের বাড়ি থেকে বাধ্যতামূলক ইফতারি প্রদান বন্ধ করে দিই!




