পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছিলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার যুবক আবদুর রহিম। ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করতে রাশিয়ায় গেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে যোগ দিতে হয় দেশটির সেনাবাহিনীতে। পরিবারের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে যাওয়ার দিনই ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি।
সোমবার সন্ধ্যায় মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকে শোকের মাতম চলছে ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে আবদুর রহিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের ভাঙাচোরা দুটি ঘরজুড়ে স্বজনদের আহাজারি।
স্বজনেরা জানান, নতুন কাজে যোগ দেওয়ার পর প্রায় এক মাস ধরে মা–বাবার সঙ্গে সরাসরি কথা হতো না রহিমের। তবে দুই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল তাঁর।
ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন মা রমিছা খাতুন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার ছেলে ওয়েল্ডিংয়ের কাজে গেছে। পরে এক দালাল তারে সেনাবাহিনীতে নিছে। আমরারে কইছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরি নিছে। সেনাবাহিনীতে গেছে—কয় নাই। মরার পরে শুনলাম যুদ্ধে গেছিল। আগে জানলে রাশিয়া যাইতে দিতাম না।”
আক্ষেপ নিয়ে তিনি আরও বলেন, “বাবা কইছিল কষ্ট দূর করব, বাড়ি করব, তারপর বিয়া করব। ভালো বেতন দিব কইয়া দালাল আমার সর্বনাশ করছে। আমি দালালের বিচার চাই। আমার বাবার লাশ ফেরত চাই।”
আবদুর রহিম ছিলেন আজিজুল হক ও রমিছা খাতুন দম্পতির তিন ছেলের মধ্যে বড়। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ঋণ ও জমি বন্ধক রেখে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। সেখানে সাত বছর ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করেন। দেশে ফিরে কিছুদিন থাকার পর ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান। পরিবার জানত, সেখানেও তিনি ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছেন।
পরিবারের দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার কিছুদিন পর থেকে রহিম অনিয়মিতভাবে টাকা পাঠাতে শুরু করেন। তিন মাস আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন চাকরির কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে আরও তিন লাখ টাকা নেন। পরে জানা যায়, তিনি রুশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে ছিলেন। এক মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ১ মে কাজে যোগ দেন। পরদিন ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন।
রুশ সেনাবাহিনীতে একই ক্যাম্পে থাকা তাঁর বন্ধু লিমন দত্ত ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের তরুণ রিয়াদ রশিদের পরিবারের কাছে যোগাযোগ করেন। লিমন জানান, রিয়াদের সঙ্গে রহিমও নিহত হয়েছেন। পরে রিয়াদের পরিবার ও লিমন দত্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয় রহিমের পরিবার। নরসিংদীর বাসিন্দা লিমন দত্ত নিজেও ওই হামলায় আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
আবদুর রহিমের বাবা আজিজুল হক স্থানীয় একটি মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক। তিনি বলেন, “অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বিদেশ পাঠাইছিলাম। আমরা জানি না, কী মনে কইরা সেনাবাহিনীতে যোগ দিল। এক মাস ট্রেনিং কইরা যুদ্ধে যেই দিন গেল, সেই দিনই মারা গেছে শুনছি। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি শুধু আমার ছেলের লাশ ফেরত চাই।”
ছোট ভাই আবদুর রহমান বলেন, “ভাই কইছিল, দুই মাস পরে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, আমাদের ভাগ্য খুলবে। নতুন কোম্পানিতে গেলে মাসে দুই লাখ টাকা বেতন দিবে বলছিল। গত মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকাও পাঠাইছিল। আমরা অবাক হইছিলাম। পরে বুঝলাম অন্য কিছু ঘটছে।”
মঙ্গলবার দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শহীদুল ইসলাম এবং ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল হাসান আবদুর রহিমের বাড়িতে যান। এ সময় পরিবারের সদস্যরা মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনাসহ সরকারি সহায়তার দাবি জানান।
কামরুল হাসান বলেন, “বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। মরদেহ দেশে আনার একটি প্রক্রিয়া আছে। পরিবারকে এ অনুযায়ী আবেদন করতে বলা হয়েছে। পরিবারটি বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত, আমরা সহযোগিতার চেষ্টা করব।”
দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে ইউএনও শহীদুল ইসলাম বলেন, “মরদেহ দ্রুত দেশে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে। পাশাপাশি পরিবারটিকে মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে।”




