দেশে হামের ভয়াবহতা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত শিশু ও মৃত্যুর সংখ্যা। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে জায়গা সংকট, জরুরি বিভাগে দীর্ঘ অপেক্ষা আর অসহায় স্বজনদের কান্না; সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এত মৃত্যুর পরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৭৪ শিশু। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৭৭ শিশু।
শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই আরও ১২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে চারজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল। বাকি আটজনের শরীরে ছিল হামের উপসর্গ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৫৫ হাজার ৬১১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০ হাজার ১৭৬ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৬ হাজার ৫৫ শিশু। এ ছাড়া এ সময়ে ৭ হাজার ৪১৬ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে।
এক মাসেই বেড়েছে মৃত্যু
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপ্রিলের শেষ দিকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই শতাধিক। মে মাসের মাঝামাঝি এসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫১–এ। অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই অন্তত আড়াই শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সংক্রমণ নয়; এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।
‘বেড পাইনি, সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি’
রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর বাবা বলেন, ‘প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করাই। পরে শরীরে দানা ওঠে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ঢাকায় এনে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেছি। কোথাও বেড পাইনি।’
নারায়ণগঞ্জের এক মা বলেন, ‘ডাক্তার বলেছিলেন ভয় নেই। পরে হঠাৎ অবস্থার অবনতি হয়। আইসিইউতে নেওয়ার আগেই আমার বাচ্চাটা মারা যায়।’
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা আরেক অভিভাবকের অভিযোগ, হাসপাতালে রোগীর চাপ এত বেশি যে চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিকভাবে কথাও বলা যাচ্ছে না।
কেন থামছে না সংক্রমণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশু, সচেতনতার অভাব এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
তাঁদের ভাষ্য, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। সময়মতো টিকা দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু বহু এলাকায় এখনো টিকাদান কাভারেজ সন্তোষজনক নয়।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক পরিবার রোগের শুরুতে এটিকে সাধারণ জ্বর বা অ্যালার্জি ভেবে অবহেলা করছে। ফলে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর হাসপাতালে আনা হচ্ছে শিশুদের। তখন নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিল অবস্থা তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্নের মুখে প্রস্তুতি
স্বাস্থ্যখাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এত বড় প্রাদুর্ভাবের পরও জরুরি ভিত্তিতে বিশেষায়িত হাম ইউনিট, অতিরিক্ত শয্যা বা নিবিড় পরিচর্যা সুবিধা বাড়ানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব সীমিত।
টিকা সরবরাহ, মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয়।
এদিকে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের কথা বলেছে সরকার। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
তবে প্রতিদিন বাড়তে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আর কত সময় লাগবে?




