অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের একটি অংশ ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থান খুঁজছেন—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের এমন মন্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের পর থেকেই তাঁর বক্তব্য ঘিরে সরকারের ভেতরে ও বাইরে তোলপাড় চলছে।
৪ অক্টোবর একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বহু উপদেষ্টা ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন, অনেকে নিজেদের নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজছেন। তাঁর এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়; নেটিজেনদের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
এরপর অন্তত পাঁচজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, সড়ক ও সেতু উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ. ম. খালিদ হোসেন—নাহিদের মন্তব্য নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
এর মধ্যে পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান সরাসরি নাহিদ ইসলামকে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর বক্তব্যের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য–প্রমাণ উপস্থাপন করতে।
অন্যদিকে এনসিপি বলছে, সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের নামের তালিকা তাদের হাতে রয়েছে। দলটির দাবি, কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরে পড়তে চাইছেন, তা তারা শিগগিরই জাতির সামনে প্রকাশ করবে।
দলটির ভেতর থেকেই একাধিক নেতা মনে করছেন, উপদেষ্টা পরিষদে কয়েকজন রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করাই সরকারের বড় ভুল ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক নেতা বলেন, ‘যারা অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই তরুণ ছাত্র নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে সরকার গঠিত হলে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হতো না।’
বিতর্কের মুখে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন বলেন, ‘নাহিদ ইসলাম সরকারের ভেতরে থেকেই অনেক কিছু দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য নিছক রাজনৈতিক নয়; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই তিনি বলছেন।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা বাইরে থেকেও দেখছি, অনেক উপদেষ্টার ভেতর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। মনে হয় না, তারা একটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসেছেন।’
নাহিদের মন্তব্যকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া শুধু উপদেষ্টাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও জুলাই আন্দোলনের নেতা সারজিস আলমও একই সুরে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘কিছু উপদেষ্টা মনে করছেন, সামান্য দায়িত্ব পালন করলেই নির্বাচনের পর তারা নিশ্চিন্তে এক্সিট নিতে পারবেন। এমন মনোভাব নিয়ে অভ্যুত্থান-পরবর্তী কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না।’
এনসিপি নেতারা আরও অভিযোগ করেছেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ’-এর রেখে যাওয়া ‘মিডিয়া এস্টাবলিশমেন্ট’ এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং তারা সরকারের ছাত্র উপদেষ্টাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করছে। অথচ প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অনিয়ম চললেও সেসব নিয়ে কোনো প্রতিবেদন তৈরি হয় না।
দলটির অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ২৪ জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে রাজপথে রক্ত দিয়ে যে পরিবর্তনের আশা জাগানো হয়েছিল, তা এখন ফিকে হয়ে আসছে। তরুণ নেতৃত্বের পরিবর্তে পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দাপট বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, সরকার এখন এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যাতে কেবল নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী বা দলই ক্ষমতার সুবিধা পাচ্ছে।
সবশেষে, নাহিদ ইসলামের এক বক্তব্য যেন অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও টানাপোড়েনকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। এনসিপি নেতৃত্বের একাংশ এখন প্রকাশ্যেই বলছে—সরকারের কিছু উপদেষ্টা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতেই বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছেন, আর এতে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ভেতরের আস্থাহীনতা আরও গভীর হচ্ছে।




