ইসরায়েল আবারও ধরা খেল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান প্রমাণ করেছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের ওপর ইসরায়েলের চালানো বিমান হামলার অজুহাত পুরোপুরি ভুয়া। দাবি করা হয়েছিল, হাসপাতালের সিঁড়িঘরে হামাসের স্থাপন করা একটি ক্যামেরা ধ্বংস করতেই ওই হামলা। কিন্তু বাস্তবে সেই ক্যামেরা ছিল রয়টার্সের নিজস্ব সাংবাদিকের ব্যবহৃত দীর্ঘদিনের সংবাদ সরঞ্জাম।
২৫ আগস্ট চালানো ওই হামলা ছিল তথাকথিত “ডাবল-ট্যাপ”—প্রথমে আঘাত, তারপর উদ্ধারকর্মীরা ছুটে আসতেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। এতে নিহত হন ২২ জন, তাঁদের মধ্যে পাঁচ সাংবাদিকও ছিলেন। নিহতদের একজন রয়টার্সের হুসাম আল-মাসরি, যিনি নিয়মিত ওই হাসপাতালের সিঁড়িঘর থেকে লাইভ সম্প্রচার করতেন। হামলার দিনও তিনি সেখানেই ক্যামেরা বসিয়ে সংবাদ প্রচার করছিলেন। হঠাৎ প্রচার বন্ধ হয়ে যায়, আর কয়েক মুহূর্ত পরেই বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু হয়।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত ৩৫ বার একই জায়গা থেকে ক্যামেরা বসিয়ে সম্প্রচার করেছিলেন হুসাম আল-মাসরি। তিনি গরম ও ধুলো থেকে ক্যামেরা ঢেকে রাখতে প্রায়ই নামাজের জায়নামাজ ব্যবহার করতেন। অথচ ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করে, সেটি নাকি হামাসের আড়ালে থাকা একটি ক্যামেরা। এই ভুয়া দাবি দিয়ে তারা হাসপাতাল, রোগী, সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মীদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে যুদ্ধাপরাধ।
এমন হত্যাযজ্ঞ নতুন নয়। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান গাজার গণহত্যায় ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, গির্জা, এমনকি সাংবাদিক ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। শুধু সাংবাদিকই নিহত হয়েছেন ২০০-র বেশি। তবুও কোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি, প্রকাশ হয়নি কোনো প্রতিবেদন, দায়ী কাউকেই বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের প্রধান ইসমাইল আল-থাওবতা সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেছেন, “হামাস নাসের হাসপাতাল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে চিত্রায়িত করেছে—এই দাবি মিথ্যা ও মনগড়া। ইসরায়েল একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধকে ঢাকতে চাচ্ছে।”
প্রশ্ন জাগে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন যেখানে হাসপাতাল ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সেখানে ইসরায়েল কীভাবে বারবার এসব নিয়ম ভেঙে পার পেয়ে যাচ্ছে? সাংবাদিকদের সুরক্ষা, মানবিক নীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে বিশ্ব কি তবে নীরব দর্শক হয়ে গেছে?
প্রত্যেকটি হত্যাযজ্ঞ শুধু গাজার মানুষ নয়, বিশ্ব বিবেকের ওপর আঘাত। নাসের হাসপাতালের এই হত্যাযজ্ঞ আবারও দেখিয়ে দিল—যতই অজুহাত দাঁড় করানো হোক, সত্য চাপা থাকে না। একদিন এই ভুয়া যুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের জবাবদিহি করতেই হবে।




