বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ‘ফাইভ-জি উপযোগীকরণে অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম আলো জানায়, প্রকল্পের কেনাকাটায় অনিয়ম ও ঘাটতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তদন্ত শুরু করে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম কেনাকাটা প্রক্রিয়া স্থগিত করেন এবং তদন্তের নির্দেশ দেন। তবে দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হতেই বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এই প্রকল্পের যন্ত্রপাতি কেনার তোড়জোড় শুরু করেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৬৩ কোটি টাকায় যন্ত্রপাতি কেনার কথা। প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং মাত্র চার দিনের মধ্যে দরপত্র মূল্যায়ন করে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে টেকনোলজিসকে কাজ দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠে, দরপত্রের শর্ত পূরণ না করেও প্রভাব খাটিয়ে কাজ দেওয়া হয় এবং অনুমোদিত প্রকল্প পরিকল্পনা (ডিপিপি) ভঙ্গ করে পাঁচ গুণ বেশি সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, বিটিসিএলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসাদুজ্জামান অনিয়মের কারণে দরপত্র বাতিল করে নতুন করে আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তখনকার টেলিযোগাযোগ সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান এবং যুগ্ম সচিব তৈয়বুর রহমান তার ওপর চাপ প্রয়োগ করেন এবং শেষে তাকে অপসারণ করে মামলা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিযুক্ত হয়ে আবার হুয়াওয়েকে কাজ দেন।
বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ফয়েজ আহমদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০ দিনের মাথায় হুয়াওয়ের কারখানা পরিদর্শনের তোড়জোড় শুরু করেন এবং বিটিসিএলকে আইনগত মতামত নিতে বলেন। যদিও বিটিসিএলের নিজস্ব আইনজীবী প্যানেল থাকা সত্ত্বেও একটি বেসরকারি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে মতামত নেওয়া হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি অনিয়ম জানার পর মত পরিবর্তন করে জানায়, তদন্তাধীন প্রকল্পে সরকারি ক্রয় আইন অনুযায়ী কেনাকাটা অবৈধ হবে।
এর পরও ফয়েজ আহমদ ১৩ এপ্রিল দুদক চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে কেনাকাটা এগিয়ে নেওয়ার জন্য ইতিবাচক মতামত চান। দুদক ১৮ জুন জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ক্রয় আইনের লঙ্ঘন পাওয়া গেছে, তাই কেনাকাটা অবৈধ হবে। এরপরও তিনি আবারও চিঠি পাঠান এবং ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।
এদিকে, ফয়েজ আহমদ নিজের একান্ত সচিবসহ এক অচেনা চায়নিজ সংস্থার খরচে ৪ দিনের সফরে চীন যান। সফরের কারণ হিসেবে জিওতে বলা হয়, আইসিটি অবকাঠামো নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গেছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে, বিটিসিএলের দাপ্তরিক চিঠি কীভাবে হুয়াওয়ে পেয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। হুয়াওয়ে চিঠির তথ্য অনুযায়ী সরঞ্জাম জাহাজীকরণ করে বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠায়। যন্ত্রপাতি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ব্যাংক সূত্র জানায়, আমদানির কোনো নথি এখনো জমা পড়েনি, ফলে টাকা ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এ অবস্থায় যন্ত্রপাতি গ্রহণ করা হলে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে এবং না করলে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তাধীন প্রকল্পে কেনাকাটা দুর্নীতি সহায়ক। সরকার যদি বলে যন্ত্রপাতি না কিনলে বড় ক্ষতি হবে, তাহলে তার কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস কোথায়? তিনি মনে করেন, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে প্রকল্প পর্যালোচনার প্রয়োজন ছিল।




