দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানের পথে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময়ের বিষয়ে বুধবার (৮ অক্টোবর) সমঝোতায় পৌঁছেছে ইসরায়েল ও হামাস। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
হামাসের সীমান্ত হামলার দুই বছর পূর্তির একদিন পর মিশরের শার্ম আল-শেখ শহরে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনায় ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি কাঠামোর প্রাথমিক পর্যায়ে এই সমঝোতা আসে। গত দুই বছরে সংঘাতের আগুনে ইরান, ইয়েমেন ও লেবাননের মতো দেশগুলো জড়িয়ে পড়ে, যা পুরো অঞ্চলকে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ঠেলে দিয়েছিল।
বুধবার রাতে ট্রাম্প চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রুথ সোশালে। তবে বিস্তারিত জানানো না হওয়ায় সংশয় রয়ে গেছে আগের ব্যর্থ আলোচনার মতো এটিও থেমে যেতে পারে কি না। তবু এই চুক্তি সফল হলে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের জন্য এটি হবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি সাফল্য।
“ইসরায়েল ও হামাস উভয়ই আমাদের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে স্বাক্ষর করেছে,” লিখেছেন ট্রাম্প। তিনি জানান, খুব শিগগিরই সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং ইসরায়েল স্থায়ী শান্তির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নির্দিষ্ট একটি রেখা পর্যন্ত সৈন্য প্রত্যাহার করবে। ইসরায়েলি সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, শনিবার থেকেই জিম্মি মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, “ঈশ্বরের সাহায্যে আমরা আমাদের সব জিম্মিকে ঘরে ফিরিয়ে আনব।” তিনি জানান, চুক্তি অনুমোদনের জন্য বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকা হয়েছে।
অন্যদিকে, হামাসও নিশ্চিত করেছে যে তারা যুদ্ধ অবসানে চুক্তিতে পৌঁছেছে। এতে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও জিম্মি–বন্দী বিনিময় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সংগঠনটি ট্রাম্প ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, ইসরায়েল যেন যুদ্ধবিরতির শর্ত সম্পূর্ণরূপে মেনে চলে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তি “প্রায় সম্পন্ন” এবং তিনি সপ্তাহের শেষে মিশর সফরে যেতে পারেন। তিনি বলেন, “সকল পক্ষকে ন্যায্যভাবে বিবেচনা করা হবে। আরব ও মুসলিম বিশ্ব, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি মহান দিন।”
তিনি কাতার, মিশর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের ধন্যবাদও জানান।
এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইসরায়েলের পক্ষে অংশ নেন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী রন ডারমার।
তবে শান্তির আশা জাগলেও এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে চুক্তির সময়সূচি, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা প্রশাসন এবং হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হিসেবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে গাজায় ৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে উপত্যকার প্রায় সব এলাকা। ইসরায়েলি তথ্য অনুযায়ী, হামাসের আক্রমণে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়; বর্তমানে ৪৮ জন এখনো বন্দী আছেন, তাঁদের মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামাস ইতিমধ্যে জিম্মি ও বন্দী বিনিময়ের তালিকা ইসরায়েলকে দিয়েছে। এতে মারওয়ান আল-বারঘুতি ও আহমেদ সাদাতের মতো উচ্চপ্রোফাইল বন্দীরাও রয়েছেন, যাঁরা ইসরায়েলিদের হত্যার দায়ে একাধিক যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। হামাস স্পষ্ট সময়সূচিসহ পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা চেয়েছে। ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, ইসরায়েলি দখল অব্যাহত থাকলে হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে না।
যদিও ট্রাম্পের অনুরোধে ইসরায়েল সামরিক অভিযান কিছুটা কমিয়েছে, তবু হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও গাজা সিটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত ছিল। গাজার চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আটজন নিহত হয়েছেন— যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন দৈনিক নিহতের সংখ্যা।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি ও ট্রাম্প “অত্যন্ত আবেগঘন” ফোনালাপে চুক্তির ঐতিহাসিক অর্জনের জন্য একে অপরকে অভিনন্দন জানান। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলি পার্লামেন্টে (নেসেট) ভাষণ দেওয়ার আমন্ত্রণও দিয়েছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই যুদ্ধবিরতিকে দ্বি–রাষ্ট্র সমাধানের পথে “সময়োপযোগী সুযোগ” আখ্যা দিয়ে বলেন, “গাজায় অবিলম্বে মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক সামগ্রীর প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এই দুর্ভোগের অবসান এখন অত্যাবশ্যক।”




