সোমবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরের পর থেকে নজিরবিহীন এক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়ে স্পেন ও পর্তুগাল। হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায় ট্রাফিক সিগন্যাল, স্তব্ধ হয়ে যায় সাবওয়ে চলাচল, অচল হয়ে পড়ে বিমানবন্দর ও শহরের ব্যস্ত জীবনযাত্রা। পরিস্থিতি সামাল দিতে উভয় দেশই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
পর্তুগালের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড অপারেটর রেডেস এনর্জেটিকাস ন্যাসিওনাইস (REN) জানায়, দুপুরের কিছু পরে পুরো আইবেরীয় উপদ্বীপজুড়ে এবং ফ্রান্সের কিছু অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, বিভ্রাটের আসল কারণ এখনো নির্ণয় করা যায়নি।
বিভ্রাটের প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক এবং ভয়াবহ। সড়কবাতি নিভে যাওয়ায় রাজধানী মাদ্রিদসহ বড় বড় শহরে সৃষ্টি হয় যানজট। সাবওয়ে ট্রেনগুলো মাঝপথে থেমে যায়, দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, সুপারমার্কেট বন্ধ হয়ে যায়, আর নগদ অর্থ ছাড়া লেনদেন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা লুইস ইবানেজ জিমেনেজ বলেন, “আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি সব ট্রাফিক বাতি বন্ধ। রাস্তা যেন একটা বিশৃঙ্খল জঙ্গল হয়ে গেল। সামনে একটা বিশাল বাস দেখতে পেয়ে আমি কোনোমতে দ্রুত গতি বাড়িয়ে বেরিয়ে আসি।”
বিভ্রাটের কারণ পরিষ্কার না হলেও এর প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। দুই দেশের সরকার জরুরি বৈঠকের আয়োজন করে সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার চেষ্টা করে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্দালুসিয়া, এক্সত্রেমাদুরা, মুরসিয়া, লা রিওজা ও মাদ্রিদ অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। রাতভর মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর, পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনেগ্রো ‘এনার্জি ক্রাইসিস’ ঘোষণা করেন এবং জানান বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধার একটি জটিল প্রক্রিয়া হবে।
সন্ধ্যার দিকে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ফিরতে শুরু করে। স্পেনের পরিবেশমন্ত্রী সারা আাগেসেন জানান, সোমবার সন্ধ্যায় দেশটির প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। এদিকে, পর্তুগালে বিদ্যুৎ ফিরে আসার মুহূর্তে মানুষের উল্লাসের দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

মাদ্রিদের মেয়র হোসে লুইস মার্টিনেজ আলমেইদা মানুষকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার অনুরোধ করেন এবং জরুরি যানবাহনের চলাচলের জন্য রাস্তা ফাঁকা রাখার আহ্বান জানান। পরে মাদ্রিদের জরুরি পরিষেবা বিভাগ জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি তোলে এবং স্থানীয় নেতা ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো সেনাবাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানান।
এদিকে, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও কস্তা জানান, বিভ্রাটের কারণ পরিষ্কার নয়, তবে এটি কোনো সাইবার হামলার ফল বলে এখনো কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের জন্য স্পেনকেই ইঙ্গিত করেছেন। তিনি জানান, সমস্যা পর্তুগালে শুরু হয়নি এবং সব তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিভ্রাটের সূচনা স্পেনে। পর্তুগালের REN প্রধান জোয়াও ফারিয়া কনসেইসাও বলেন, পর্তুগাল সকালে স্পেন থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে, কারণ সেসময় স্পেনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সস্তা হয়। কিন্তু বিভ্রাটের সময় স্পেন ফ্রান্স ও মরক্কো থেকে কিছু সহায়তা পেলেও পর্তুগালের তেমন কোনো বিকল্প ছিল না।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবে দক্ষিণ ইউরোপের ব্যস্ত অঞ্চলগুলো থমকে যায়। মাদ্রিদ, লিসবন, বার্সেলোনা, সেভিয়া ও ভ্যালেন্সিয়ার মতো শহরগুলো, যেগুলো পরিবহন, অর্থনীতি ও পর্যটনের বড় কেন্দ্র, কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা ছিল ইউরোপের ব্যস্ততম পাঁচটি বিমানবন্দরের মধ্যে।
এই সময়টাতে নগদ অর্থ লেনদেন চালু হয়, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ হাতের ইশারা ব্যবহার করে, এবং রেস্তোরাঁ, সুপারমার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। মাদ্রিদে দমকল বাহিনী সোমবার দিনে ১৭৪টি লিফট উদ্ধারের অভিযান চালায়। অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও টিনজাত খাবার মজুত করতে দোকানে ভিড় করেন।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। স্পেনের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নিরাপদ এবং সচল রয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। পর্তুগালের জরুরি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ তাদের ব্যাকআপ জেনারেটর চালু করে জরুরি ব্যবস্থা নেয়, স্পেনের হাসপাতালগুলিতেও একই ব্যবস্থা গৃহীত হয়।
তবে ভ্রমণ খাতে বিপর্যয় দেখা দেয়। বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্ব ঘটে, অনলাইন ফ্লাইট ট্র্যাকারগুলো রিপোর্ট করে, দুপুরের পর একাধিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পর্তুগালের জাতীয় এয়ারলাইন্স টিএপি বিমান সংস্থা জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরে ভ্রমণ না করতে।
লিসবনের হাম্বের্তো ডেলগাডো বিমানবন্দরে শত শত মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে জানান এক পর্যটক। দোকানগুলো কেবল নগদ অর্থ গ্রহণ করছিল।
স্পেনে ট্রেন চলাচলও স্থগিত হয়। মাদ্রিদের মেট্রো পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায় এবং স্টেশনগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্ধকারে আটকে থাকা মেট্রো ট্রেনগুলো।
এছাড়া, মাদ্রিদ ওপেন টেনিস টুর্নামেন্টও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থগিত করা হয়। দক্ষিণ ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলেও বিদ্যুৎ সমস্যা হয়, তবে তা দ্রুত সমাধান করা হয়।
সোমবার কয়েক ঘণ্টা ধরে আইবেরীয় উপদ্বীপের প্রায় ৬ কোটি মানুষ জানতে চাইছিলেন, কখন বিদ্যুৎ ফিরবে এবং কেন এই বিভ্রাট ঘটল। এখন বিদ্যুৎ ফেরার পরও, পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েকদিন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্পেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্য ও দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল মঙ্গলবারের আগে চালু হবে না এবং ফ্লাইট বিলম্বের প্রভাব পুরো সপ্তাহজুড়ে থাকতে পারে।





