প্রতিবছর ১ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় মহান মে দিবস—একটি দিন যেটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকেরা যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা শুধু আমেরিকাতেই নয়, সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এক চেতনার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাদের প্রধান দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা শ্রম, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা ব্যক্তিগত জীবনের জন্য সময়—একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের অধিকার।
আজ ২০২৫ সালেও আমরা এই দিনটি উদযাপন করি, স্মরণ করি সেই ত্যাগ ও সংগ্রাম। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আসলে কতটা নিশ্চিত হয়েছে শ্রমিকের অধিকার? কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাসম্পন্ন হয়েছে একজন শ্রমিকের কর্মজীবন?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখনো লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করছেন নামমাত্র মজুরিতে, অমানবিক পরিবেশে এবং প্রায়ই কোনো নিরাপত্তাহীন অবস্থায়। তৈরি পোশাক শিল্প, নির্মাণ খাত, কৃষি কিংবা পরিবহন—প্রত্যেক জায়গায় শ্রমিকের জীবনের ঝুঁকি, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
একদিকে শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, অপরদিকে তারাই সবচেয়ে অবহেলিত। এই বৈপরীত্য দূর না হলে ‘উন্নয়ন’ শুধু পরিসংখ্যানে থাকবে, বাস্তবে নয়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, ছুটি, শ্রমঘণ্টার সীমাবদ্ধতা এবং সংগঠন গঠনের অধিকার—এই মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত না করলে টেকসই কোনো সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
সরকার এবং মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে, শ্রমিককে খুশি না রেখে কোনো প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারে না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মধ্যেও সচেতনতা, সংগঠন এবং অধিকার আদায়ের মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। একতাই শক্তি—এই বার্তাটি তাদের মনে গেঁথে দিতে হবে।
মে দিবস শুধুই একটি প্রতীকী দিন নয়; এটি একটি প্রতিজ্ঞার দিন। সেই প্রতিজ্ঞা হলো—শ্রমিককে মানুষ হিসেবে দেখা, তার অধিকারকে সম্মান করা এবং উন্নয়নের ভাগিদার হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া।
অতএব, মহান মে দিবস আমাদের শুধু অতীতের গৌরবগাথা স্মরণ করায় না, বরং এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশও দেয়—যেখানে শ্রমিকের অধিকার হবে অবিচ্ছেদ্য, এবং তার জীবন হবে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ।




