কৃষকের পেশা ও সম্পদ রক্ষায় ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ৮৯৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে সরকার। তবে এসব বাঁধের মাটি নদী ও হাওরে ভরাট হয়ে জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্বশীলদের অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণে ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে ব্যয়বহুল বাঁধ থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য; দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক।
জেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধানই সারা বছরের প্রধান ফসল। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল হাওরপাড়ের মানুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বোরো ফসল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেখার, শনি, ছায়ার ও ঝাওয়ার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় নিচু জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত পানি জমে রয়েছে, ফলে কাঁচা ধান পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলায় বর্তমানে ৫৭৭টি কম্বাইন হারভেস্টার সচল রয়েছে এবং আরও ১০৮টি মেরামতযোগ্য। এগুলো দ্রুত সচল করতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় ভাড়াভিত্তিতে ৫০টি হারভেস্টার সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও হারভেস্টার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি শ্রমিকসংকটও প্রকট হয়ে উঠছে। আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক এলেও গত পাঁচ বছর ধরে সে প্রবণতা কমে গেছে। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে দুর্বল বাঁধ ভেঙে ফসলহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, প্রতিবছর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও নদী ও হাওরের নালা-খাল খননে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। ফলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে জমিতে পানি জমে থাকে। আবার বাঁধের মাটিও নদী ও হাওরে পড়ে ভরাট সৃষ্টি করছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, জেলায় ফসলরক্ষা বাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৭১৮ কিলোমিটার এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য ক্লোজার রয়েছে ১১০টি। ৪৮টি হাওরে প্রতিবছর ডুবন্ত মাটির বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়, যার মধ্যে ১২ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ রয়েছে।
জেলায় ১২টি উপজেলার ১৩৭টি ছোট-বড় হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়। এসব জমি থেকে বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের ধান উৎপাদিত হয়।
এদিকে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে কৃষক ও বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধনও করেছেন।
সচেতন মহল বলছে, হাওরাঞ্চলের নদী ও খাল খনন, পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্লুইসগেট নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। তা না হলে প্রতিবছর ব্যয়বহুল বাঁধ নির্মাণ কেবল সাময়িক সমাধান হয়ে থাকবে।
দেখার হাওরের কৃষক ফারুক মিয়া বলেন, জমিতে বেশি পানি থাকায় মেশিন নামানো যাচ্ছে না। কাদার কারণে হাওরে প্রবেশই কঠিন হয়ে পড়েছে। নালা-খাল খনন ও সড়ক সংস্কার না হওয়ায় পানি নামছে না।
মাটিয়ান হাওরের কৃষক সাফিল মিয়া বলেন, শ্রমিকসংকটের কারণে ধান কাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। যন্ত্রের সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া কিছু জাতের ধানে উৎপাদন কম হয়েছে।
শনি হাওরের কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, একমাত্র বোরো ফসল নষ্ট হলে জীবিকা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তখন অনেকেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টির পানিতে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকদের ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত পাকা ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, জেলার ১৩টি নদীর ৩০৩ কিলোমিটার খননের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। এ ছাড়া আরও ৪০০ কিলোমিটার নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ফসল কাটার মৌসুমে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও সার্ভিস নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় বালুমহাল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে।





