রাত পেরিয়ে সকাল। গাজার আকাশে তখনও ধোঁয়া ভাসছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর ভোরের আলো পড়ছে নিঃশব্দে। এই ভূমি গত দুই বছর ধরে আচ্ছাদিত শোকের কালো ধোঁয়ায়। বোমায় ভাঙা স্কুল, ছিন্ন দেয়ালে শিশুর আঁকা সূর্য—সবকিছু যেন থমকে গেছে এক অদৃশ্য অপেক্ষায়। ঠিক তখনই এক খবর ছড়িয়ে পড়ল—“যুদ্ধবিরতি!” ফলে আনন্দ–স্বস্তি ছুঁয়ে গেছে গাজার বাসিন্দাদের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করলেন—ইসরায়েল ও হামাস তাঁর প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সই করেছে।
দুই বছরের রক্তক্ষয়, ৬৭ হাজারের বেশি প্রাণহানি, লাখো মানুষ গৃহহীন। এমন এক সময়ের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই ঘোষণা—মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যেন হঠাৎ ঝলসে ওঠা এক নতুন আলো।
ট্রাম্পের ‘শান্তির নকশা’ :
মাত্র এক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউসের এক বিকেলে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন ট্রাম্প। সেদিন তিনি যে ২০ দফা পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন, সেটিই আজ বাস্তবতার প্রথম ধাপে দাঁড়িয়েছে।
পরিকল্পনার মূল কথা সহজ: বন্দি বিনিময়, যুদ্ধবিরতি, ইসরায়েলি সেনাদের পিছু হটা, আর গাজায় ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের নিশ্চয়তা।
নিজের পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “সব বন্দি খুব শিগগির মুক্তি পাবে। ইসরায়েল সম্মত রেখা পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করবে। এটাই হবে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির প্রথম ধাপ।”
কাতার, মিসর ও তুরকিকে তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, “সব পক্ষের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা হবে।”
বিবৃতির ভাষায় একধরনের আত্মবিশ্বাস আছে। কিন্তু শান্তির পথে অভ্যস্ত নয় গাজার মানুষ; তারা জানে, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মাঝে কতখানি দূরত্ব।
বিবৃতির ভাষায় একধরনের আত্মবিশ্বাস আছে। কিন্তু শান্তির পথে অভ্যস্ত নয় গাজার মানুষ; তারা জানে, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মাঝে কতখানি দূরত্ব।
ইসরায়েলের হাসি, হামাসের সতর্কতা :
রাতের দিকে নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, “এটি ইসরায়েলের জন্য এক মহান দিন।”
অন্যদিকে হামাসও বিবৃতি দেয়—তারা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশকে আহ্বান জানিয়েছে, “ইসরায়েল যেন চুক্তি বাস্তবায়ন থেকে পিছু না হটে।”
হামাসের ভাষায়, “আমরা আমাদের জনগণের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেব না।”
দুই পক্ষের এই পার্থক্যই বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। একপাশে বিজয়ের উল্লাস, অন্যপাশে সতর্কতার সুর—শান্তির সেতু কি এই দুই মাটিকে যুক্ত করতে পারবে?
গাজার প্রতিক্রিয়া: আনন্দ, আতঙ্ক আর ক্লান্তি :
গাজার মধ্যাঞ্চলীয় শহর দেইর এল–বালাহ থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজজুম জানিয়েছেন, খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেক পরিবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। কেউ চিৎকার করে “আলহামদুলিল্লাহ” বলেছে, কেউ শুধু কেঁদেছে—বেঁচে থাকার ক্লান্তি আর আশার অশ্রু মিশে গেছে একসঙ্গে।
তবে তাঁর কণ্ঠে সতর্কতার সুরও আছে। “যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর হয়নি। অনেক এলাকা এখনো ‘রেড জোন’। তবু মানুষ একটু নিঃশ্বাস ফেলতে চায়, অন্তত এক রাত ভয় ছাড়া ঘুমোতে চায়।”
গাজার এক বৃদ্ধা, আমিনা খাতুন, তাঁর ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমার তিন ছেলে নেই, ঘর নেই, কিন্তু শান্তি এলে হয়তো নাতিদের বাঁচাতে পারব।”
বিশ্বের চোখে এক ‘অস্থায়ী আশাবাদ’ :
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে বলেছেন “এক বহুল প্রত্যাশিত অগ্রগতি”। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুইজনই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক মহলে স্বস্তির হাওয়া, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে এক অনিশ্চয়তার গন্ধ। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী অধ্যায় প্রায়ই শুরু হয়েছে নতুন সংঘাতে।
শান্তির পরের চ্যালেঞ্জ :
চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলি সেনারা পিছু হটবে, আর ৭২ ঘণ্টা পর হামাস শুরু করবে বন্দি মুক্তি। এরপর গাজার যুদ্ধ–পরবর্তী প্রশাসন দেখভালের জন্য ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ গঠিত হবে, যার সভাপতি তিনি নিজেই।
কিন্তু অনেক বিশ্লেষকের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মানবাধিকার সংস্থা ডন-এর ইসরায়েল–ফিলিস্তিন বিষয়ক পরিচালক মাইকেল শ্যাফার ওমার–ম্যান বলেন, “হামাস বহু আগেই যুদ্ধ শেষের বিনিময়ে বন্দি মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েল অতীতে প্রতিটি যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে। এবার তারা কি ভিন্ন আচরণ করবে?”
তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধবিরতি মানে শুধু গুলি থামানো নয়—অবরোধ তুলে নেওয়া, ত্রাণ ও বাণিজ্য চলাচল স্বাভাবিক করা—এসবই শান্তির বাস্তব চেহারা।”
শান্তির লড়াই এখনো শেষ হয়নি :
ট্রাম্পের এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কিন্তু এটি কি স্থায়ী শান্তির সূচনা, নাকি আরেকটি সাময়িক বিরতি—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলে না।
গাজার আকাশে ধোঁয়া এখনো পুরোপুরি সরেনি, বাতাসে এখনো পুড়ে যাওয়া ঘরের গন্ধ। তবু সেই আকাশের নিচেই কিছু শিশু হয়তো আজ প্রথমবারের মতো খেলায় মত্ত হয়েছে, এক বৃদ্ধা মৃদু কণ্ঠে দোয়া পড়েছেন—“হে আল্লাহ, এবার যেন শান্তি সত্যি হয়।”
এই মানবিক মুহূর্তটিই হয়তো প্রমাণ করে—যুদ্ধের মাঝেও মানুষ শান্তির স্বপ্ন দেখতে জানে। আর সেই স্বপ্নই এখন গাজার ধ্বংসস্তূপে একমাত্র সম্বল।




