ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর তাঁকে ভারতে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খুব শিগগিরই ভারতের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন এবং তখন থেকেই সেখানেই নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশ দাবি করছে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির ভিত্তিতেই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো ভারতের ‘বাধ্যতামূলক দায়িত্ব’। দুই দেশের এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০১৩ সালে। ওই সময় বাংলাদেশ ভারতের হাতে সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের বেশ কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে তুলে দিয়েছিল—যা এখন বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থানের পক্ষে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।
বাংলাদেশের আহ্বানের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে নিয়ে ঘোষিত রায় ভারত লক্ষ্য করেছে এবং প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। পাশাপাশি ভারত সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত থাকার কথাও জানায়।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি আসলেই চুক্তি অনুযায়ী হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য? নাকি আন্তর্জাতিক আইন, ঘরোয়া বিধান ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এ বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বিবেচনাধিকার-নির্ভর?
প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান
২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত এবং ২০১৬ সালে কিছু সংশোধনের মধ্য দিয়ে আরও সহজ করা এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ, বিদ্রোহ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ দমন। চুক্তিতে বলা আছে—যেসব অপরাধে অন্তত এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেগুলো প্রত্যর্পণের আওতায় পড়বে। ‘কম্পোজিট অফেন্স’ বা বহু অপরাধ একত্রে গঠিত অভিযোগও এর মধ্যে রয়েছে।
হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধ চুক্তির আওতাভুক্ত এবং এগুলোকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না—এমন স্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। তাই চুক্তির ভাষায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যর্পণের উপযোগী।
প্রত্যাখ্যানের সুযোগ কোথায়
চুক্তিতে কিছু স্পষ্ট ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত অভিযোগ হলে প্রত্যর্পণ নাকচ করা যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হলো—যদি অনুরোধের নেপথ্যে সৎ উদ্দেশ্য না থাকে, কিংবা অনুরোধ বৈষম্যমূলক হয়, সেক্ষেত্রে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
শেখ হাসিনার আইনজীবীদের বক্তব্য—তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে সৃষ্ট। ভারত চাইলে এই যুক্তিকে ভিত্তি করেই প্রত্যর্পণ এড়াতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড: আইনি ও নৈতিক বাধা
চুক্তিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ নিষিদ্ধ—এমন সরাসরি কোনো ধারার উল্লেখ নেই। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধান অনুযায়ী, যেখানে নির্যাতন, নিপীড়ন বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি আছে, সেখানে কাউকে ফেরত পাঠানো নন-রিফাউলমেন্ট নীতির পরিপন্থী। ভারত আইসিসিপিআরের সদস্য হওয়ায় এই নীতি তাদের বিবেচনায় রাখতে হয়।
ভারত সাধারণত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের আগে শাস্তি লঘু করার নিশ্চয়তা চায়। আবু সালেমকে পর্তুগাল থেকে ফেরত পাঠানোর সময় এমন শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে মৃত্যুদণ্ড নিজেই একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ আইন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
ভারতের এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট–১৯৬২ অনুযায়ী, প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত, আদালতের মতামত এবং কেন্দ্রীয় সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারই নেয়।
ভারত অতীতে বাংলাদেশে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যদের হস্তান্তর করেছে, তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কাউকে—এখন পর্যন্ত কখনো প্রত্যর্পণ করেনি। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা থাকলে মানবিক কারণেও প্রত্যর্পণ না করার নজির রয়েছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ ছিল। নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক প্রভাব—সব দিক থেকেই হাসিনার প্রতি ভারতের আস্থা ছিল প্রবল। ফলে তাঁকে ফেরত পাঠানো কৌশলগত সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
কূটনীতির হিসাব–নিকাশ
শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে বর্তমান ইউনুস সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবুও ভারত অতীতে সব সময়ই কৌশলগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতাও ভারতের নীতিতে বিদ্যমান।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে—চুক্তিটি পদ্ধতি নির্ধারণ করলেও, ব্যতিক্রমগুলোর কারণে ভারতের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। মৃত্যুদণ্ড থাকা অবস্থায় ভারত চাইলে সহজেই প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তাই সিদ্ধান্তটি একান্তই আইন, কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক স্বার্থের জটিল সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে।
এককথায়, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো ভারত ‘করতেই হবে’—চুক্তি তা বলে না। বরং সিদ্ধান্তের ভার এখন মূলত দিল্লির কৌশলগত টেবিলেই।




