যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার পর ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক ও কৌশলগত। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ‘ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী আক্রমণাত্মক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেয়। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্ট করে যে, এটি সীমিত প্রতিশোধ নয়; বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু তিনটি—তীব্র আঘাত সহ্য করে টিকে থাকা, পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং প্রতিপক্ষকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যয়ে জড়ানো। এটি প্রচলিত সমমুখী যুদ্ধ নয়; বরং অসম প্রতিরোধভিত্তিক কৌশল, যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের বদলে স্থিতিস্থাপকতা ও বহুমুখী আক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের সামরিক কাঠামো: দ্বৈত বাহিনী ও বহুপদ কমান্ড
ইরানের সামরিক শক্তিকে প্রায়ই অস্বচ্ছ ও জটিল বলা হয়। দেশটিতে সমান্তরাল দুটি বাহিনী রয়েছে—নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘আরতেশ’ এবং আইআরজিসি। উভয় বাহিনী সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীন, যিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
আরতেশের কাজ মূলত সীমান্ত রক্ষা, আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ ও প্রচলিত যুদ্ধ পরিচালনা। অন্যদিকে আইআরজিসি শুধু সামরিক শক্তি নয়, রাজনৈতিক কাঠামো সুরক্ষার দায়িত্বও পালন করে। ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রভিত্তিক সক্ষমতার বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সমান্তরাল কাঠামো ইচ্ছাকৃত—এটি একদিকে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা দখলের ঝুঁকিও কমায়। ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ—দুইয়ের সমন্বয়ে ইরান তার সামরিক স্থিতি ধরে রেখেছে।
পাল্টা হামলার ধরন: ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি
সাম্প্রতিক হামলার পর ইরান শাহেদ ড্রোন ও উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আঘাত হানে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশে বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা যায়; দুবাইয়ের পাম জুমেইরা ও বুর্জ আল আরব এলাকায় আগুনের খবর পাওয়া যায়। আবুধাবি বিমানবন্দরে একটি ঘটনায় হতাহতের কথাও জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে প্রাণহানি ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হলেও, কিছু আঘাত সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় পড়েছে। প্রতিহত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষও কিছু এলাকায় পড়ে ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে।
এ ধরনের হামলা ইরানের নতুন কৌশলের অংশ—প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত করা, প্রতিনিয়ত প্রস্তুত অবস্থায় রাখতে বাধ্য করা এবং অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ তৈরি করা।
জুন ২০২৫ যুদ্ধ: মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল প্রথমে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত হয়ে নাতাঞ্জ, ফোর্দো ও ইসফাহান স্থাপনায় বাঙ্কার-ভেদী হামলা চালায়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
সেই যুদ্ধ ইরানের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। পারমাণবিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সামরিক নেতৃত্বে ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তেহরান সামরিক নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে। প্রতিরোধমূলক অবস্থান থেকে সরে এসে তারা আগাম চাপ সৃষ্টি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার পথে হাঁটে।
বিশ্লেষকদের মতে, জুনের যুদ্ধ ছিল প্রক্সি-নির্ভর সংঘাত থেকে সরাসরি উচ্চমাত্রার মুখোমুখি লড়াইয়ে উত্তরণের সূচনা। এখন ইরান আগেভাগেই ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার আক্রমণ ও জ্বালানি-চাপ কৌশলকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করছে।
দ্বিতীয় আঘাত সক্ষমতা ও ‘মিসাইল নগরী’
ইরানের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘দ্বিতীয় আঘাত সক্ষমতা’ বজায় রাখা। অর্থাৎ প্রথম দফার বড় হামলায় ক্ষতি হলেও পাল্টা আঘাতের শক্তি অক্ষুণ্ন রাখা। এজন্য ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ছড়িয়ে থাকা কমান্ড কাঠামো এবং শক্তিশালী ড্রোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
এই কৌশলে সব আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা নয়; বরং আঘাতের পরও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা মুখ্য। এতে প্রতিপক্ষকে দ্রুত বিজয়ের আশা থেকে দূরে রাখা যায়।
আঞ্চলিক চাপ ও হরমুজ প্রণালি
ইরান আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় রেখেছে, যাতে সংঘাতের ক্ষেত্র বিস্তৃত থাকে। এতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক ফ্রন্টে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে হয়।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি ইরানের অর্থনৈতিক চাপের কৌশল। বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে যায়। প্রণালিতে অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধ হয়নি, তবু জাহাজ চলাচলে সতর্কতা বৃদ্ধি ও নোঙর করার প্রবণতা দেখা গেছে।
কৌশল কতটা কার্যকর?
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। ইরান প্রমাণ করেছে, বড় আঘাতের পরও তারা তাৎপর্যপূর্ণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম। এতে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে থাকতে হচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে কৌশল আংশিকভাবে প্রতিরোধ গড়লেও, তা বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষতি ঠেকাতে পারেনি।
কতদিন টিকতে পারবে এই সংঘাত?
সামরিকভাবে ইরান তুলনামূলক কম ব্যয়ে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি ও সাইবার অভিযান দীর্ঘ সময় চালাতে পারে। এগুলো দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং ছড়িয়ে থাকা অবকাঠামো থেকে পরিচালিত হওয়ায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করা কঠিন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে বলে উন্মুক্ত সূত্রে জানা গেছে। ইসরায়েল সক্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছে। প্রযুক্তিগত ও আকাশশক্তিতে তারা এগিয়ে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমাত্রার যুদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াবে—ইরানের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও জনমতের প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—পূর্ণাঙ্গ সর্বাত্মক যুদ্ধের বদলে ওঠানামা করা, পর্যায়ক্রমিক তীব্রতা ও বিরতির সংঘাতই বেশি সম্ভাব্য। ইরান সম্ভবত উত্তেজনা বাড়ানো ও সীমিত বিরতির মধ্যে দোলাচল কৌশল বজায় রাখবে।
এই সংঘাত কতদূর গড়াবে, তা নির্ভর করবে সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং পরবর্তী নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।
আলজাজিরা থেকে অনূদিত




