মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর ইউনিয়নের ডবলছড়া চা বাগানের শিক্ষার্থীদের জীবনে কষ্টের যেন শেষ নেই। দুর্গম পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ আর জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হয় এই অবহেলিত জনপদের প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীকে। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হলেও ডবলছড়া থেকে কালিছালি আবাসন পর্যন্ত মাত্র ৩ কিলোমিটার সড়কটি চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় চরম ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটছে চা বাগানের সাত শতাধিক পরিবারের।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডবলছড়া এলাকায় বিকল্প কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা চিৎলিয়া জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়। বাগান থেকে স্কুল পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় উঁচু-নিচু টিলা আর খানাখন্দে ভরা প্রায় ৩ কিলোমিটার দুর্গম পথ। বর্ষাকালে এই পথ হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ।
ডবলছড়া চা বাগানের শিক্ষার্থী বাদল সাঁওতাল ও শিলা নাইডু তাদের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, আমাদের স্কুলে যাওয়াটা একটা বড় সংগ্রাম। কোনো পাকা রাস্তা নেই। পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। হঠাৎ বৃষ্টি এলে মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই ভিজে ভিজেই ক্লাসে যেতে হয়, আবার ফিরতে হয়। এই রাস্তা দিয়ে যেতে আমাদের খুব ভয় লাগে।
যাতায়াত ব্যবস্থা আদিম রয়ে যাওয়ায় এখানকার প্রায় সাতশ পরিবারের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা। ডবলছড়া বাগান পঞ্চায়েতের অর্থ সম্পাদক সজল বৈদ্য বলেন, আমাদের বাগান ও আশেপাশে প্রায় তিনশত শিক্ষার্থী রয়েছে। ডবলছড়া থেকে কালিছালি আবাসন পর্যন্ত এই ৩ কিলোমিটার রাস্তা চলাচলের একদম অনুপযোগী। আমরা জনসাধারণ এবং শিক্ষার্থীরা চরম অবহেলার শিকার। এই ঝুকিপূর্ণ রাস্তার কারনে আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়ে যেতে ভয় পায়। একটি ভালো রাস্তার জন্য আমরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করছি।
মানবিক দিকটি তুলে ধরে পল্লী চিকিৎসক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, আমি প্রায় সময় চিকিৎসা সেবা দিতে এই এলাকায় যাই। তখন চোখে পড়ে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের করুণ চিত্র। অন্তত মানবিক দৃষ্টি থেকে তাদের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
চিৎলিয়া জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহিন মিয়া শিক্ষার্থীদের এই দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ডবলছড়া এলাকার শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে বিদ্যালয়ে আসে। এই দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াত যেমন কষ্টকর, তেমনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই রাস্তাটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।
রাস্তাটির বর্তমান অবস্থা এবং আইনি জটিলতা নিয়ে শমসেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও কমলগঞ্জ উপজেলা আইসিটি অফিসার মো. রকিবুল হক বলেন, রাস্তাটি বন বিভাগের জায়গার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সরাসরি কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা বা এখতিয়ার বহির্ভূত বিষয় রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের কষ্টের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। দ্রুতই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করব।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষাকালে এই রাস্তাটি ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়। বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে ডবলছড়া এলাকার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথকে সুগম করতে। এই সামান্য ৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হলে পাল্টে যাবে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর ভাগ্য এবং কয়েক হাজার মানুষের জীবনযাত্রার মান। শিক্ষা ও যাতায়াতের নূন্যতম অধিকার ফিরে পেতে এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ডবলছড়া চা বাগানের অবহেলিত মানুষগুলো।




