সুমনের এই মহাপ্রয়াণে বার্মিংহামের গণমাধ্যমজগতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু ক্ষণস্থায়ী নয়—এটি এক গভীর ক্ষত। এই শূন্যতা কবে পূরণ হবে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। কারও কাজের ধরন, দক্ষতা বা কৌশল অন্য কেউ পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। হয়তো একই জায়গায় নতুন কেউ আসেন, কিন্তু সেই মানুষটির অভাব থেকেই যায়।
তাঁর পরিবার কখনো এই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে কি না—আমরা জানি না। আমাদের চারপাশ যেন এক অজানা শূন্যতায় ভরা, যা আমরা অনেক সময় উপলব্ধি করতে পারি না। আমরা সময়ের কাছে অসহায়। চলে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই—তাই অনেক সময় অসময়েই মানুষ না-ফেরার দেশে চলে যায়।
সমাজের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে সাংবাদিকতার স্বপ্ন দেখা একজন স্বপ্নবাজ মানুষের অকালপ্রয়াণে আমরা বাকরুদ্ধ। না-ফেরার দেশে ভালো থেকো—সবার প্রিয় কায়সারুল ইসলাম সুমন।
৩ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার পারিবারিক কাজে বার্মিংহামের বাইরে স্কানথর্প শহরে ছিলাম। অসুস্থ এক আত্মীয়কে দেখতে বিকেল দুইটায় রওনা দিই এবং সেখান থেকে ঘরে ফিরি রাত একটায়। পথে মুঠোফোন দেখা হয়নি। পরে হঠাৎ চোখ গেলে দেখি মারুফ ভাইয়ের ফোন। তিনি বাংলা প্রেসক্লাব বার্মিংহাম মিডল্যান্ডসের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান আহ্বায়ক। তাঁর একটি অনুত্তরিত কল ছিল।
মারুফ ভাইয়ের ফোন মানেই সাধারণত জরুরি কিছু। তিনি অকারণে ফোন দেন না। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ফোন করি। তিনি ফোন ধরে কান্নাভেজা কণ্ঠে যে খবরটি দিলেন, তা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারিনি। ফোন রেখে একা কান্নায় ভেঙে পড়ি। মনে পড়ে যায়—“কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত”—প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
তারপরও কিছু মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। বুক ভেঙে কান্না আসে। মনে হয় চিৎকার করে কাঁদি। এই পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই নিজস্ব স্বপ্ন নিয়ে জীবন সাজায়। কত পরিকল্পনা, কত আয়োজন! ভবিষ্যৎ ভেবে মানুষ নিজেকে জড়ায় নানা কাজে। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে কত চেষ্টা, কত পরিশ্রম।
নিজের মেধা ও দক্ষতায় মানুষ নিজেকে সমাজের কাছে প্রয়োজনীয় করে তুলতে চায়। কিন্তু আমরা কি জানি, আল্লাহ আমাদের জন্য কী নির্ধারণ করে রেখেছেন? আমরা কেউ জানি না, এক মুহূর্ত পর আমাদের ভাগ্যে কী আছে।
খবরটি জানার পর সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল গত ১৩–১৪ বছরের বাংলা প্রেসক্লাব বার্মিংহাম মিডল্যান্ডসের নানা স্মৃতি—সামাজিক তৎপরতা, সম্মেলন, লন্ডনে যাওয়া-আসা।
২০০৫ সালের দিকে হবে। তখন সমশেদ বক্তত চৌধুরী স্মলহীথ এলাকার গীতাঞ্জলী রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ এক তরুণ ঢুকল—হাসিখুশি, প্রাণবন্ত। কথা বলল, আবার দ্রুত চলে যেতে চাইছিল। তখন তিনি তাঁকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিলেন—মৌলভীবাজারের ছেলে, নাম কায়সারুল ইসলাম সুমন। সেদিনই প্রথম পরিচয়।
২০১২ সালে বাংলা প্রেসক্লাব বার্মিংহাম মিডল্যান্ডস গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে আমিও যুক্ত হই। সুরমার ঢেউ পত্রিকার বার্মিংহাম প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিই। কয়েকটি বৈঠকে অংশ নিয়ে সুমনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এরপর বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে প্রায়ই দেখা হতো, কথা হতো।
পরে তিনি টেলিভিশনমাধ্যমে কাজ শুরু করেন। এনটিভি, চ্যানেল নাইন এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত এটিএন বাংলার মিডল্যান্ডস ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আজকের দিনে প্রযুক্তির কারণে কাজ সহজ হলেও ১৫–১৬ বছর আগে প্রবাসে সাংবাদিকতা করা ছিল কঠিন। যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত ছিল, সংবাদ সম্পাদনা, লেখা ও পাঠানো—সবকিছুতেই সময় লাগত। তখন অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করতেন, পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন কম।
সুমন ছিলেন একজন পরীক্ষিত সংবাদকর্মী। নানা প্রতিকূলতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর মেধা, সাহস ও গণমাধ্যমের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে। স্পষ্টভাষিতা, প্রতিবাদী মনোভাব ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবেও তিনি ছিলেন পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ।
তিনি ছিলেন কৌতুকপ্রিয়, সহজ-সরল এবং মানুষের সঙ্গে দ্রুত মিশে যেতে পারতেন। কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল অসাধারণ।
রাজনীতির প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি বিএনপির একজন নিবেদিত কর্মী ছিলেন। যদিও পারিবারিকভাবে তাঁদের পরিবার ছিল আওয়ামী লীগপন্থী। তাঁর বড় ভাই মামুন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ছিলেন।
সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সুমন দেশে যান। সহকর্মীদের সঙ্গে বিদায় নিয়ে হাসিমুখে নিজের জন্মভূমি মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ফিরে যান। তখন কেউ ভাবেনি, সেটিই হবে তাঁর শেষ যাত্রা।
দেশে যাওয়ার আগে নানা আড্ডায় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনি, এত প্রাণবন্ত মানুষটি এভাবে হঠাৎ চলে যাবেন।
হাসি-আনন্দে বিদায় জানানো সেই মুহূর্তই যে চিরবিদায়—তা কেউ ভাবেনি। এখন ভাবলে মন ভারী হয়ে আসে। আমরা জীবনে কত পরিকল্পনা করি, কত স্বপ্ন দেখি। অথচ আমাদের জন্য কী নির্ধারিত—তা আমরা জানি না।
পরিবারসহ আনন্দ নিয়ে দেশে গিয়েছিলেন তিনি। প্রিয় দল, প্রিয় মানুষ—সবকিছু নিয়ে ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই তিনি চলে গেলেন অনন্তের পথে।
তাঁর এই মহাপ্রয়াণে বার্মিংহামের গণমাধ্যমজগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। হয়তো নতুন কেউ আসবেন, কিন্তু তাঁর মতো মানুষ আর আসবেন না।
আমাদের চারপাশে এই শূন্যতা থেকে যায়। আমরা সময়ের কাছে অসহায়। চলে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় নেই—তাই অনেক সময় অসময়েই মানুষ চলে যায়।
সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে স্বপ্ন দেখা এক স্বপ্নবাজ সাংবাদিকের অকালপ্রয়াণে আমরা বাকরুদ্ধ।
না-ফেরার দেশে ভালো থেকো— প্রিয় কায়সারুল ইসলাম সুমন।




