আমরা মানুষ। জগতের একটি ক্ষুদ্র সৃষ্টি। এমন আরও কত কিছু যে দয়াময় আল্লাহ সৃষ্টি করে রেখেছেন এ জগতে, সংখ্যা দিয়ে তা প্রকাশ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু একটি বিন্দুতে এসে সকল বৈচিত্র্য মিলে একাকার হয়ে গেছে। তাহলো— এ জগতের কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়, সবই ক্ষণস্থায়ী, সবই ধ্বংসশীল। সব শেষে টিকে থাকবে আল্লাহর মহান সত্তা। মহান আল্লাহ বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেছেন—
كُلُّ مَنْ عَلَیْهَا فَانٍ، وَّ یَبْقٰی وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلٰلِ وَ الْاِكْرَامِ
‘ভূপৃষ্ঠে যা আছে সবই নশ্বর। অবিনশ্বর কেবল তোমার প্রতিপালকের সত্তা, যিনি মহিমময়, মহানুভব।’ (সূরা আর-রাহমান: আয়াত ২৬-২৭)
বাংলা প্রবাদে আমরা শুনেছি— ‘জন্মিলে মরিতে হইবে, অমর কে কোথা কবে’। এ কথাটি অস্বীকার করার সাধ্যও কারও নেই। তাও শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, জগতের যত জীব, সবকিছুকেই গ্রহণ করতে হয় মরণের স্বাদ। পবিত্র কুরআনে এ চিরসত্যটি একাধিক স্থানে আলোচিত হয়েছে—
كُلُّ نَفْسٍ ذَآىِٕقَةُ الْمَوْتِ
‘প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৮৫)
মৃত্যুর আগে কালেমার তালকীন
মৃত্যু হচ্ছে দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি আবার আখেরাতের জীবনের সূচনা। এই দুনিয়া ‘মাযরাআতুল আখিরাহ’ বা আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়ার জীবন যার যেমন কাটবে, পরকালে এর ফলই সে তেমনই ভোগ করবে। এ জন্য শেষ পরিণতি ভালো হওয়া জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنّمَا الأَعْمَالُ بِالْخَوَاتِيمِ
‘আমল তো শেষ অবস্থা অনুসারেই বিবেচিত হবে।’ (বুখারি ৬৬০৭)
প্রবাদও আছে— শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। সবমিলিয়ে বলা যায়, আখেরাতে সুন্দর জীবনের জন্যে সুন্দর মৃত্যুর বিকল্প নেই। মৃত্যুর সময় যদি ইমানটাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায়, দুনিয়ার সব দুঃখ-কষ্ট তখন তুচ্ছ। আর যদি এর বিপরীত কিছু হয়, শয়তানের ধোঁকায় কেউ নিজের ইমান হারিয়ে বসে, জগতে তার চেয়ে হতভাগা আর কে হতে পারে! এজন্যে কোনো মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে যারা উপস্থিত থাকবেন, তাদের প্রথম কর্তব্য হলো তাকে কালেমায়ে তায়্যিবার তালকীন দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَقِّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ
‘তোমরা তোমাদের মৃত্যুগামী ব্যক্তিদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’র তালকীন করো।’ (মুসলিম ৯১৬, ৯১৭)
তালকীন কী?
তালকীনের অর্থ হচ্ছে— মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে একটু আওয়াজ করে কালেমা পড়তে থাকা। তবে মনে রাখতে হবে, এ অবস্থায় তাকে কিছুতেই মুখে উচ্চারণ করে কালেমা পড়ার আদেশ করা যাবে না। জোরাজুরি করা যাবে না; এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই নিয়ম হলো— তার পাশে বসে মৃদু আওয়াজে কেবল কালিমা পড়তে থাকা। কালিমা বলুন বা এজাতীয় কিছু না বলা। তার পাশে যখন কালেমা পড়া হবে, তিনি যখন কালেমার আওয়াজ শুনতে পাবেন, আশা করা যায়, তিনি নিজেই কালেমা পড়ে নিতে পারেন। এ কালেমা যার জীবনের শেষ কথা হবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ كَانَ آخِرُ كَلاَمِهِ لاَ إِلَهَ إِلاّ اللهُ دَخَلَ الْجَنّةَ
‘যার শেষ কথা হবে-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (আবু দাউদ ৩১১৮)
হাদিসে পাকে মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে থেকে সুরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করার কথাও রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
اقْرَءُوا (يس) عَلَى مَوْتَاكُمْ
‘মৃত্যুপথযাত্রী যারা তাদের পাশে থেকে তোমরা সুরা ইয়াসিন পাঠ করো।’ (আবু দাউদ ৩১২৩; ইবনে হিব্বান ৩০০২)
ছোট ও সহজ এ দুটি আমলের পাশাপাশি দূরের-কাছের সকলেরই উচিত-তার জন্যে দোয়অ করা। তার মৃত্যু যেন সহজ হয় এবং ঈমানের সঙ্গে হয়-এ দোয়া করা। এ দোয়াটুকুর জন্যে পাশে থাকারও প্রয়োজন নেই। কোনো আপনজনের মুমূর্ষু অবস্থার সংবাদ পেলে তার জন্যে যথাসাধ্য দোয়া করা উচিত। এতে শুধু তারই উপকার হবে— এমন নয়; বরং দোয়াকারীর উপকারও এতে কম নয়। হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, কোনো মুসলিম ভাইয়ের জন্যে দূর থেকে কোনো দোয়া করলে ফিরিশতারা বলে তাকেও (দোয়াকারীকেও) যেন এ বিষয়গুলো দান করা হয়। তাই অন্য কারও জন্যে দোয়া করা, কারও মুমূর্ষু অবস্থায় সহজ মৃত্যু এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুর জন্যে দোয়অ করলে লাভবান হবে দোয়াকারী নিজেও।




