সুনামগঞ্জের হাওরে বোরো ফসলের মাঠের দিকে তাকালে মনে হয় কৃষকের আনন্দের যেন শেষ নেই, পরক্ষণেই তা পাল্টে যায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় কথা মনে পড়লেই স্বস্তি বদলে ফসল হারানোর ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তায় হাওরপাড়ের কৃষকের কপালে ভাজ পড়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি সময় শেষ হলেও ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। ফলে ৫ হাজার কোটি টাকার ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই হাওরবাসীর।
হাওরপাড়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক ফসলী জমিতে উৎপাদিত ধানই সারা বছরের শেষ সম্ভল কৃষক পরিবারের। কষ্টে ফলানো ফসল রক্ষা করে বাঁধ। প্রতি বছরের মতো এবারও সেই বাঁধের কাজ নিয়ে হতাশা কৃষকদের। কারণ, নির্ধারিত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাঁধের কাজ হয়েছে মাত্র ৫০–৫৫ শতাংশ। নানান অজুহাতে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবো। কিন্তু তারা বাঁধ নির্মাণে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে। কাজেও হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। বাঁধে কম্পেকশন, কার্পেটিং, ঘাস লাগানোসহ অন্যান্য কাজ শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে বাঁধ সময়মতো শুরু ও শেষ হয়নি।
বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। নামে কৃষক থাকলেও এর পেছনে ছিল বাঁধ নির্মাণের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যারা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই দায়সারা কাজ করছে। বাঁধে ছিল না সাইনবোর্ড, পিআইসির সভাপতি, সদস্য সচিবসহ দায়িত্বশীল লোকজন। বাঁধে দেওয়া হয়েছে মাটি, সেই মাটি বাঁধের কাছ থেকে আবার কখনও ফসলী জমি ও কান্দা (হাওরের মধ্যে উঁচু জমি) কেটে নেয়া হয়েছে। নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে বাঁধে দুরমুজ না করা সহ সকল কাজে অনিয়ম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে অভিযোগ জানানো হলেও কেনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
জেলার খরচার হাওরপাড়ে কৃষক সফিউল আলম জানিয়েছেন, বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় ভারত থেকে অসময়ে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের পানিতে বাঁধ ভেঙে শ্রমে ঘামে ফলানো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন হাওরপাড়ের হাজার হাজার কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।
আরেক কৃষক হোসেন মিয়া বলেন, “বাঁধ নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। ফসল রক্ষা বাঁধগুলো সময়মতো হলে দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে পারি। কিন্তু প্রতি বছরের মতো বাঁধের কাজ শেষ হয়নি।”
জেলার সচেতন মহল বলছেন, শুরুতেই পিআইসি গঠনে অনিয়ম, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পসহ রয়েছে অতিরিক্ত বরাদ্দ। সেই অনিয়ম ঢাকতে নির্বাচনের দোহাই দিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় এবার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ হচ্ছে। কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী কাজের শুরু ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। শেষ দিন পর্যন্ত বাঁধের ৭৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। টাকা বরাদ্দ হয়েছে ৪৭ কোটি, কয়েক দিনের মধ্যে আরও ২০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে।
জাতীয় নির্বাচনের কারণে কাজে কিছুটা ধীরগতি ছিল। আরও ১৪–১৫ দিন মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে, জানিয়েছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তিনি আরও জানান, বাঁধের কাজের অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ। মাটির কাজ প্রায় শেষের দিকে।
পাউবোর কাজে অগ্রগতি ও কাজের মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাওর নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেছেন, পাউবোর দেয়া তথ্যের সাথে বাস্তবে বাঁধের কাজের কোনো মিল নেই।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় জানিয়েছেন, বাঁধের কাজ নিয়ে আমরা শঙ্কিত, কারণ বাঁধের কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে না। অগ্রগতি খুবই হতাশাজনক। নীতিমালা অনুযায়ী ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ করার কথা থাকলেও শেষ হয়নি। ফলে আগাম পানি আসলেই বাঁধ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ফসল তলিয়ে যাবে। আমরা আইনের আশ্রয় নেব।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, এবারে দুই লাখ ৩০ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হবে জেলার ১২টি উপজেলায়। উৎপাদন হবে ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান, যা টাকার অংকে পাঁচ হাজার ২৮ কোটি টাকা।





