সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন, আধুনিক নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্ন হুমায়ুন কবিরের কাছে ৬ দফা উন্নয়ন দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকবৃন্দ।
উপজেলাটিতে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চনা, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে এসব দাবি এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনদাবিতে পরিণত হয়েছে।
নাগরিকদের অভিযোগ,সিলেট গ্যাস উৎপাদন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন এলাকার বহু উপজেলায় এখনো গ্যাস সংযোগ পৌঁছেনি। বিগত সরকারের আমলে ওসমানীনগর উপজেলার মহাসড়ক এলাকায় গ্যাস সংযোগ প্রদানের লক্ষ্যে লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হলেও পরবর্তীতে মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের কারণে তা অপসারণ করা হয়।
ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথ উপজেলার বাসিন্দারাও দীর্ঘদিন ধরে এ মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এ অবস্থায় স্থানীয়দের পক্ষ থেকে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও ক্ষুদ্র শিল্পখাতে দ্রুত গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া সিলেট-২ আসনের অন্তর্গত বিশ্বনাথ উপজেলা পৌরসভায় উন্নীত হলেও ওসমানীনগর এখনো পৌরসভা ঘোষণা পায়নি। পরিকল্পিত নগরায়ন, আধুনিক নাগরিক সেবা, সড়কবাতি, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে দ্রুত ওসমানীনগরকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি উঠেছে।
স্বাস্থ্য খাতেও রয়েছে চরম সংকট। সদ্য প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত এবং ডাক্তার-নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শিক্ষা খাতেও নানা সমস্যা বিদ্যমান। উপজেলার বহু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষার মানোন্নয়নে দায়িত্বে অবহেলাকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এব্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাস্তবায়নের দাবি এখন ওসমানীনগরবাসীর অন্যতম প্রধান প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি নানা জটিলতায় আটকে থাকায় উপজেলার শিক্ষার্থীরা আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত এ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় যুবসমাজ দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হবে, বেকারত্ব কমবে এবং দেশ-বিদেশের কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। তাই উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে অবিলম্বে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে।
প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ তাজপুর ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. খসরুজ্জামান বলেন, এই আসনে সরকারের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দায়িত্বে রয়েছেন। অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ছাড়া আধুনিক ও সমৃদ্ধ উপজেলা গড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, জনগণ বহু বছর ধরে উন্নয়নের আশায় অপেক্ষা করছে। এখন আর প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের সময় নয়, বাস্তব কাজের সময়। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।
এদিকে উপজেলার বিভিন্ন বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকায় ড্রেনেজ সংকট ও অবৈধ দখলের কারণে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পাশাপাশি কুশিয়ারা নদীসহ আশপাশের এলাকায় নদীভাঙন, দুর্বল বাঁধ এবং অবৈধ দখলের ফলে প্রতি বছর বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। এ অবস্থায় টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, গ্রামীণ সড়ক সংস্কার এবং নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে।
খেলাফত মজলিস সিলেট জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও বুরুঙ্গা বাজার পরিচালনা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাফিজ সাইদুর রহমান জানান, নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান ও টেকসই উন্নয়ন জরুরি। ডাল-চাল বিতরণের রাজনীতি বাদ দিয়ে কর্মমুখী উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষা-প্রশিক্ষণভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই মানুষের জীবনমানের বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।
বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক লিয়াকত শাহ ফরিদী জানান, ওসমানীনগর একটি সম্ভাবনাময় উপজেলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, জনবান্ধব পরিকল্পনা, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে এ উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।




