বিএনপি ২৩৭টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে, যা দলটির নির্বাচনী প্রস্তুতির আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সোমবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে দলটির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই তালিকা ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে ঘোষিত এই তালিকা চূড়ান্ত নয়, এখনও প্রায় ৬৩টি আসন খালি রাখা হয়েছে শরিক দল ও মিত্রদের সঙ্গে আসন বণ্টনের আলোচনার জন্য। দলটির শীর্ষ সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রার্থিতা নির্ধারণে আন্দোলনে সক্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা ও মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়তা—এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ঘোষিত তালিকায় রয়েছে প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত উভয় রকম চমক। অনেক প্রবীণ নেতা ও আলোচিত মুখ বাদ পড়েছেন। সাবেক সংসদ সদস্য ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ—তালিকায় নেই তাঁদের নাম। এতে দলের ভেতরে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বগুড়ার দুই আসনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। বগুড়া–৬ আসনে তারেক রহমানের নামও বিবেচনায় রয়েছে বলে দলের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানিয়েছে। দিনাজপুর, কুমিল্লা, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশালের কয়েকটি আসনে নতুন প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—তাঁরা সাম্প্রতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। একই সঙ্গে কিছু জেলায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের তরুণ নেতাদেরও প্রার্থী করা হয়েছে, যাতে ‘নতুন মুখ’ তুলে ধরার বার্তা দেওয়া যায়।
সিলেট অঞ্চলে মনোনয়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। সেখানে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, ফয়সল আহমদ চৌধুরী ও তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির মনোনয়ন না পাওয়ায় স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বিস্ময় দেখা গেছে। সিলেট–১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন প্রয়াত খন্দকার আবদুল মালিকের ছেলে খন্দকার মুক্তাদির আহমদ, আর সিলেট–২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন ২০১২ সাল থেকে নিখোঁজ সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। সিলেট–৬ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী।
চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তীব্র। আন্দোলনে ভূমিকা ও তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে বেশ কয়েকজন পুরোনো নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় নেতা আমিনুল ইসলাম ও রাজশাহীর নেতা শফিকুল হক মিলন তালিকায় স্থান পাননি। তাঁদের জায়গায় মনোনয়ন পেয়েছেন মাঠপর্যায়ের সক্রিয় নেতারা।
দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই তালিকা প্রাথমিক। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার পর বাকি ৬৩টি আসনের প্রার্থী ও শরিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় চূড়ান্ত করা হবে। নারী প্রার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে—দলটি ঘোষণা করেছে, আসন্ন নির্বাচনে অন্তত পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপি এবার তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী ও কৌশলগত প্রার্থী বাছাই করছে। আন্দোলন ও নির্বাচনের সমান্তরাল প্রস্তুতির মধ্যে দলটি যেভাবে তরুণ ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের এগিয়ে রাখছে, তাতে তারা নির্বাচনী বার্তায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে আলোচিত ও প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা বাদ পড়ায় দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে বিএনপির ঘোষিত এই ২৩৭ আসনের প্রার্থী তালিকা নতুন প্রজন্ম ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের একটি মিশ্রণ তৈরি করেছে—যেখানে দলটি একদিকে পুরোনো চেনা মুখ থেকে কিছুটা সরে আসছে, অন্যদিকে নির্বাচনে নতুন মুখ দিয়ে মাঠে নামার ইঙ্গিত দিচ্ছে।




