আশির দশকে হাফেজ্জি হুজুরের হাত ধরে চাঙা হওয়া ইসলামি রাজনীতির অমিত সম্ভাবনা খেয়ে দিয়েছে শিয়া ইস্যু। জুলাইয়ের পর ইসলামী রাজনীতি বিকশিত হওয়ার, আলেমদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির যে সোনালি সুযোগ এসেছিলো, মওদুদী-জামায়াত দ্বন্দ্বে সেটা এখন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যতিক্রম ও বৈচিত্রপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে এবার। ঘণ্টার কাঁটায় অপেক্ষা করছে কাঙিক্ষত ভোটের ক্ষণ। দুই যুগের বেশি সময় যারা একজোটে ছিলো, তারাই এবার মুখোমুখি। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।
তিনবার রাষ্ট্রপরিচালনা করা দল বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তারই সহযোগী জামায়াতের বিরুদ্ধে। আওয়ামী ড্রাকুলামুক্ত নির্বাচনে জয় যেখানে বিএনপির সহজ লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিলো, সেটা হতে যাচ্ছে তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। যদিও একপেশে ‘বুদ্ধিজীবীরা’ জোর করে বলার চেষ্টা করছেন, দুই শতাধিক আসন নিয়ে সরকার গঠন করবে বিএনপি। এবার সেটা ঘটার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বরং বিএনপি সরকার গঠন থেকেই পিছিয়ে পড়তে পারে বা কোয়ালিশন সরকার গঠনে যেতে হতে পারে, এমন বাতাবরন বইছে।
তবে এমন ‘খালি মাঠে’ বিএনপি ২০০ আসন ক্যাচ করতে না পারলে, তাদের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে হবে। নেতাদের আওয়ামী বয়ানবাজি ও নতুন নেতৃত্বের ঘাটতিগুলো পেশাদারিত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
দুই
নির্বাচনে এবার প্রায় তিনশ’ আলেম প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ক্ষেত্রবিশেষ সকলেই কওমি আলেম। এমন বিপুল আলেম প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারত, পাকিস্তান তো বটেই, গোটা বিশ্বেই বিরল। বাংলাদেশের জন্য এ এক অনন্য নজির।
এমন বিরল অর্জনে কাঁটা হলো রাজনৈতিক বিভক্তি। ফ্যাসিবাদী আমলে যারা একে অন্যের সহায়ক ছিলেন, এবার উন্মুক্ত মাঠে পরষ্পর প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় আভ্যন্তরীণ বিরোধও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আস্তিনে থাকা হাতিয়ার হাতে উঠে এসেছে। বাক্যবাণ ও ফতোয়া হয়ে পরষ্পরকে বিদ্ধ করছে।
হাফেজ্জী হুজুরের ইরান সফরের পর ইসলামী রাজনীতি যে সংকটে আটকে গিয়েছিলো, সেই খাদের কিনারে আবার দাঁড়িয়ে গেছে। তখন ছিলো শিয়া ইস্যু, এবার মওদুদী-জামায়াত।
আশির দশকে হাফেজ্জি হুজুরের হাত ধরে চাঙা হওয়া ইসলামি রাজনীতির অমিত সম্ভাবনা খেয়ে দিয়েছে শিয়া ইস্যু। জুলাইয়ের পর ইসলামী রাজনীতি বিকশিত হওয়ার, আলেমদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির যে সোনালি সুযোগ এসেছিলো, মওদুদী-জামায়াত দ্বন্দ্বে সেটা এখন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্যাসিবাদী আমলে আওয়ামী আনুকুল্য পেতে ‘মুখোশ উন্মোচন’ করা একদল লোকের তৎপরতা আমরা দেখেছি। এখন সেখানে কেবলা পাল্টেছে, নতুন মুখের যোগ হয়েছে।
যে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে দুই যুগের প্রণয়ে ছিল, সেই বিএনপির মঞ্চ এখন শোভাবর্ধন করেছেন নতুন মুখোশ উন্মোচকরা। আসছে ফতোয়া, ছাপা হচ্ছে বই। হক-বাতিল বিতর্কে যাচ্ছি না, এটাই হলো রাজনৈতিক প্রবণতা। একই দৃশ্য ছিলো আওয়ামীলীগের ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগের যখন জামায়াতকে দরকার ছিলো, তখন একাত্তরকে পায়ে পিষতে কুণ্ঠিত হয়নি। এ জন্য বলি, এদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মীয় আকিদা দুইধারী তরবারি। এইসব রাজনীতির দিন যে শেষ হয়ে গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারি সেটা স্পষ্ট হবে।
তিন
বিএনপি না জামায়াত সরকার গঠন করবে, এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র উদ্বেগ-উৎসাহ নেই। আমি শঙ্কিত এই নির্বাচন ইসলামী রাজনীতি ও কওমিতে যে ক্ষত তৈরি করবে, সেটা নিয়ে। বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলে, ইসলামী রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব বাড়বে, জমিয়তকে কেন্দ্র করে হেফাজতে জটিল অবস্থা তৈরি হবে। জমিয়ত-ইসলামী আন্দোলনের সমন্বয়ে নতুন হেফাজত আসতে পারে। এইসব সম্ভাবনা আরও তীব্র করবে সিলেট-৫ আসন। ইসলামি রাজনীতির ভবিষ্যৎ ঘ্রাণ বিলানো ফুল হবে, নাকি ক্ষত সৃষ্টির কাঁটা হবে, সেটা নির্ধারণ করবে এই আসনের ফলাফল।
সিলেট-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান। দল ভিন্ন হলেও দুজনই কওমির আস্থাভাজন আলেম। ভোটের মাঠে উভয়েরই রয়েছে শক্ত অবস্থান।
ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভালো অবস্থানে আলেম আছেন, এটা সুখকর হলেও এই অসনের জন্য সেটা হয়ে গেছে অস্বস্তির! অন্তত দলীয় কর্মী যারা না, তাদের জন্য স্পষ্টই অস্বস্তি। এই অস্বস্তিতে স্বস্তি দিতে পারে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের জয়। কোন কারণে উবায়দুল্লাহ ফারুক ভোটে হেরে গেলে এবং সেটা মুফতি আবুল হাসানের কাছে হলে, কওমিতে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের নতুন সূত্রপাত ঘটাবে। এর প্রভাবে জাতীয় পর্যায়ে ইসলামি রাজনীতিতে প্রলয় ঘটাবে।
সিলেট-৫ রাজনীতির ফুল না কাঁটা হবে?





